ইসকন সদস্যরা ফ্রি চিকিৎসা পেলেও সাধারণ রোগীদের চরম ভোগান্তি

এহতেশামুল হক শাওন, খুলনা

ইসকন সদস্যরা ফ্রি চিকিৎসা পেলেও সাধারণ রোগীদের চরম ভোগান্তি

নিখুঁতভাবে রোগ নির্ণয় এবং থাইরয়েড ও ক্যানসারসহ দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা দিতে প্রতিষ্ঠিত খুলনা পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্র এখন নিজেই রোগাক্রান্ত। সকাল সাড়ে ৮টার আগেই সিরিয়াল নেওয়া বন্ধ হওয়ায় দূর-দূরান্তের রোগীদের ভোগান্তির যেন অন্ত নেই।

জরুরি প্যাথলজি টেস্টের রিপোর্ট পেতে ৮-১০ দিন বিলম্ব হবে-এ অজুহাতে রোগীদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেবাকেন্দ্রের বেহাল দশার জন্য ভুক্তভোগীরা দায়ী করছেন পরিচালক ডা. ঝর্ণা দাসকে। যিনি টানা ২১ বছর একই কেন্দ্রে চাকরি করছেন। তার বিরুদ্ধে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে বসে উগ্রবাদী ধর্মীয় সংগঠন ‘ইসকন’-এর কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে ১৯৮৩ সালে খুলনা পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্র (ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস-ইনমাস) প্রতিষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রের আধুনিকায়ন ও সেবার পরিধি বাড়লেও জনবল সংকট প্রকট। ফলে এক পদের কর্মীকে অন্যত্র কাজ করানো ছাড়াও আউটসোর্সিং কর্মচারী দিয়ে চাহিদা পূরণ করা হয়। এতে কাজের মান খারাপ হওয়ার পাশাপাশি আগত রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসবের প্রতিকার চেয়ে পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে একাধিকবার আবেদন করেছেন। কেনাকাটায় দুর্নীতি তদন্তের জন্য আবেদন করেছেন কমিশনের পরিচালকের (অর্থ) কাছে।

প্রাপ্ত লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত এক মাসে সরেজমিনে সরকারি এই সেবা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্যাথলজি সেন্টারে যান আমার দেশ প্রতিবেদক। আগত রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া যায় অভিযোগের সত্যতা। সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে রোগীদের সিরিয়াল নেওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা মানুষ ফিরে যেতে বাধ্য হন। অত্যাধুনিক চারটি মেশিন থাকা সত্ত্বেও এখানে দিনে ২৫-৩০টি আলট্রাসনো হয়। হরমোন ও থাইরয়েডের বিভিন্ন ধরনের টেস্টের রিপোর্ট পেতে ৮-১০ দিন সময় লাগবে জানিয়ে দ্রুত রিপোর্টের জন্য পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার অথবা সন্ধানী ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন খোদ কাউন্টারে কর্মরতরা।

একাধিক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পরিচালকের স্বেচ্ছাচারী মনোভাব ও খামখেয়ালিপনায় এখানে অনিয়ম জেঁকে বসেছে। তিনি ২০০৫ সালে এখানে চিকিৎসা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। প্রমোশন পেয়ে ঊর্ধ্বতন চিকিৎসা কর্মকর্তা এবং সবশেষ ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর মুখ্য চিকিৎসা কর্মকর্তা ও পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান। টানা ২১ বছর এক প্রতিষ্ঠানে থাকায় তার স্বেচ্ছাচারিতা পৌঁছেছে চরমে। পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্রের চাকরিবিধি অনুযায়ী এক কেন্দ্রে তিন বছরের বেশি কাজ করার সুযোগ নেই। অথচ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতি বিরাগভাজন হলে প্রকাশ্যে অপমান করা, এসিআর খারাপ দেওয়া, এমনকি হয়রানিমূলকভাবে অন্যত্র বদলি করে থাকেন। অতিষ্ঠ হয়ে কেন্দ্রের ১৪ কর্মকর্তা- কর্মচারী একযোগে বদলি হতে পরিচালকের কাছে আবেদনও করেছিলেন।

তাদের অভিযোগ, ডা. ঝর্ণা দাস কট্টরবাদী ধর্মীয় সংগঠন ‘ইসকন’-এর সক্রিয় সদস্য ও ডোনার। ইসকন সদস্যরা নিয়মিত তার কাছে যাতায়াত করেন। প্রায়ই তার অফিস রুমে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে মিটিং হয়। সে সময় পরিচালকের রুমে কোনো স্টাফের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ইসকন সদস্যরা বিনামূল্যে এখানে টেস্ট করান এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই বিশেষ ব্যবস্থায় রিপোর্ট পেয়ে যান। অথচ সাধারণ রোগীদের রিপোর্ট পেতে দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

শুভ বলরাম ও জগন্নাথ দাস নামে দুই ব্যক্তির রসিদ পাওয়া গেছে, যারা বিনামূল্যে হোল অ্যাবডোমিন আলট্রাসনো করিয়েছেন। এখানে ইসকন সদস্যদের জন্য সব ধরনের ফ্রি টেস্ট নৈমিত্তিক ঘটনা বলে জানা গেছে। তিনি ‘শ্রীমতি ঝর্ণা দেবী দাসী’ নামে ইসকনকে চাঁদা দেন, যার রসিদ সংরক্ষিত আছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পরিচালক হওয়ার পর থেকে ডা. ঝর্ণা দাস রোগী দেখা থেকে বিরত আছেন। অথচ সপ্তাহে ছয়দিন তিনি খুলনার একাধিক বেসরকারি প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আলট্রাসনো ও টিভিএস টেস্ট করেন। পরমাণু কেন্দ্রের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি টেস্ট ফি সেখানে। নগরীর কেডিএ অ্যাভিনিউ খলিল চেম্বার মোড়ে অবস্থিত পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বেলা ৩টায় পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্রের সরকারি গাড়িযোগে নিয়মিত আসেন। এখানে একদিনে এক মেশিনে ১৭ জনের আলট্রাসনো করতে দেখা গেছে তাকে। সরকারি যানবাহন ব্যবহার করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে কোনো উদ্যোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে পরমাণু চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে ডা. ঝর্ণা দাসকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত সহকারী জানান, ম্যাডাম ছুটিতে আছেন। মোবাইলে যোগাযোগ করে অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলতে তিনি বলেন, ‘মিডিয়ার সঙ্গে আমাদের কথা বলা নিষেধ আছে। আপনি লিখিত আবেদন নিয়ে ঢাকায় যোগাযোগ করেন।’ এরপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। এরপর মোবাইল ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে এবং খুদেবার্তা পাঠিয়েও তার কাছ থেকে সাড়া মেলেনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন