সুনসান নীরবতা গোবরাকুড়া কড়ইতলী স্থলবন্দরে

​একেএম শামসুল ইসলাম, হালুয়াঘাট

সুনসান নীরবতা গোবরাকুড়া কড়ইতলী স্থলবন্দরে
ছবি: আমার দেশ

ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী উপজেলা হালুয়াঘাটের কড়ইতলী ও গোবরাকুড়া স্থলবন্দরে এখন সুনসান নীরবতা। যে বন্দর দুটি একসময় হাজারো মানুষের কোলাহলে মুখর থাকত, তা এখন কর্মহীন স্থবিরতায় এক ভুতুড়ে রূপ ধারণ করেছে। ভারতীয় কয়লা আমদানির ওপর বারবার নিষেধাজ্ঞা, আইনি জটিলতা এবং পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই স্থলবন্দরের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

​একসময় যে বন্দর দুটি থেকে প্রতি বছর শত কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হতো, তা এখন নামমাত্র অঙ্কে এসে ঠেকেছে। বাণিজ্যিক স্থবিরতা ও ক্রমাগত লোকসানের মুখে গত বছরের মার্চ মাসে সরকারি উচ্চপর্যায়ের একটি যাচাই-বাছাই কমিটি বন্দর দুটির পরিচালন ব্যয় কমানোর সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে গত বছরের ২৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সভায় গোবরাকুড়া ও কড়ইতলী স্থলবন্দরের পৃথক কার্যক্রম বন্ধ করে একটি স্থানে এনে প্রশাসনিক কার্যক্রম সংকুচিত করার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। বর্তমানে দুজন সহকারী ট্রাফিক পরিদর্শক দিয়ে নামমাত্র সেটআপে চলছে এ বন্দরের দাপ্তরিক কার্যক্রম।

বিজ্ঞাপন

​মূলত ১৯৭৯ সালে কড়ইতলী এবং ১৯৯৭ সালে গোবরাকুড়া প্রাথমিক পর্যায়ে শুল্ক স্টেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর শুল্ক স্টেশন দুটিকে স্থলবন্দর হিসেবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তীকালে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩১ একর জমিতে ওয়্যারহাউস, ইয়ার্ড, সীমানা প্রাচীর, ওয়েব্রিজ স্কেল ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণসহ অবকাঠামোগত আধুনিকায়ন শেষে, ২০২৩ সালের ১১ মার্চ এটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার পর স্থানীয় ব্যাবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মনে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যে আশার আলো জেগেছিল তাতে এখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

​ দুই বন্দরের মূল চালিকাশক্তি হলো ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা। কিন্তু ২০১৪ সালে ভারতের মেঘালয়ের একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (জাতীয় পরিবেশ আদালত) মেঘালয় রাজ্যে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন ও পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এরপর থেকেই মূলত দুই বন্দরে সংকটের শুরু। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে মাঝে কয়েকবার উচ্চ আদালতের সাময়িক নির্দেশনায় কয়লা আমদানি শুরু হলেও তা স্থায়ী রূপ পায়নি। আইনি জটিলতা ও মেঘালয় সরকারের প্রস্তাবিত কড়া শর্তের কারণে প্রায় ভারত থেকে কয়লা আসা বন্ধ হয়ে যায়।

​শুধু আইনি জটিলতাই নয়, বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় বাজারে কয়লার অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণেও আমদানিকারকরা এলসি (ঋণপত্র) খুলতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ইন্দোনেশিয়ার কয়লার তুলনায় ভারতীয় কয়লার দাম অনেক বেশি হওয়ায় বাজারে তা প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। ফলে আমদানির পরিমাণ অবিশ্বাস্য রকম কমে গেছে।

​আমদানি বন্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরকারের রাজস্ব খাতে। বন্দরের এ দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থায় চরম আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বন্দর এলাকার শত শত আমদানিকারক এখন ব্যাংক ঋণের সুদে জর্জরিত।

​মেসার্স রিমা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলিমুল ইসলাম বলেন, ‘ইটভাটাগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী কয়লা সরবরাহ করতে না পারায় কোটি কোটি টাকা বকেয়া অনাদায়ি থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে ক্রমাগত বাড়ছে ব্যাংক ঋণের সুদ। অফিস কক্ষগুলো মাসের পর মাস তালাবদ্ধ থাকায় পুঁজি হারিয়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন।’

​তবে সবচেয়ে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে বন্দরকেন্দ্রিক প্রায় সাত-আট হাজার লোড-আনলোড ও পরিবহন শ্রমিকের জীবনে। শ্রমিক নেতা নুরুজ্জামান শেখ বলেন, ‘শ্রমিকদের ঘরে চুলা জ্বলছে না।

​এদিকে শুধু কয়লা ও পাথরের ওপর নির্ভরশীলতা কাটাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ বন্দর দিয়ে গবাদিপশু, মাছের পোনা, কাঠ, ফলমূল, মসলা, চুনাপাথর, চায়না ক্লে, রাসায়নিক সার ও খাদ্যসামগ্রীসহ মোট ২৭টি পণ্য আমদানির অনুমোদন দিয়েছে।

তবে প্রসেসড ফুড, রাসায়নিক বা বিশেষ গ্যাজেটের মতো পণ্য খালাসের জন্য প্রয়োজনীয় কাস্টমস ল্যাব, কেমিক্যাল টেস্ট হাউস বা উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ ল্যাবরেটরি হালুয়াঘাটের এ বন্দর দুটিতে চালু নেই। ফলে যেসব পণ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে সেগুলো ব্যাবসায়ীরা এ বন্দর দিয়ে নামাতে পারছেন না।

কড়ইতলী কোল অ্যান্ড কোক ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের সড়ক যোগাযোগ চার লেনের হওয়ায় এ বন্দরের ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। মেঘালয়ের এ কয়লা গুণগত মানে বেশ উন্নত হওয়ায় এর চাহিদা অনেক বেশি। বন্দর দুটি পুরোপুরি সচল হলে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পারবে সরকার। নইলে ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারিয়ে অন্যান্য বন্দরমুখী হবেন, আর বেকার শ্রমিকদের বড় অংশই জড়িয়ে পড়তে পারে মাদকসহ নানা প্রকার অবৈধ ভারতীয় পণ্য চোরাচালানে। বন্দরটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শুধু অভ্যন্তরীণ আধুনিকায়ন যথেষ্ট নয়; বরং ভারত সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ওপারের সড়ক ও কাস্টমস ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন