দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল) প্রায় আড়াই বছর ধরে উৎপাদনহীন অবস্থায় পড়ে আছে। যে কারখানাটি এক সময় দেশের ১৯টি জেলার কৃষকের জন্য ইউরিয়া সার উৎপাদন ও সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, সেটিই এখন কার্যত একটি বাফার গুদামে (জরুরি প্রয়োজনে অতিরিক্ত মজুত রাখার ঘর) পরিণত হয়েছে। গ্যাস সংকটের অজুহাতে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বিদেশ থেকে আমদানি করা এবং দেশের অন্যান্য কারখানায় উৎপাদিত ইউরিয়া সার এখানে মজুত করে বিতরণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি আধুনিক সার কারখানা যদি কেবল গুদাম হিসেবেই ব্যবহৃত হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের যৌক্তিকতা কোথায়? উৎপাদন বন্ধ রেখে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানোর পেছনে কোনো স্বার্থগোষ্ঠী সক্রিয় কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে বিভিন্ন মহলে।
সারা কারাখানা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যাস সরবরাহ সংকটের কারণে ২০২৪ সালের শুরু থেকে যমুনা সার কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে কারখানাটির উৎপাদন ইউনিটগুলো নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকলেও সার সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বাফার গুদামের সার এবং আমদানিকৃত সারের চালান এখানে এনে মজুত করা হচ্ছে। পরে ডিলারদের মাধ্যমে এখান থেকে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
কারখানার নিবন্ধিত ডিলার চান মিয়া চানু বলেন, একসময় যমুনা সার কারখানা উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকদের জন্য নির্ভরতার প্রতীক ছিল। এখান থেকে ১৯টি জেলায় নিয়মিত সার সরবরাহ করা হতো। উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর বিদেশ থেকে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এতে কিছু গোষ্ঠী লাভবান হলেও রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা।
তিনি বলেন, দেশে যখন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, তখন বিদেশ থেকে সার আমদানির যৌক্তিকতা কী? দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে কারখানা চালু করা গেলে কৃষক যেমন উপকৃত হবে, তেমনি রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, উৎপাদনের জন্য নির্মিত অত্যাধুনিক কারখানাটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় যন্ত্রপাতির কার্যকারিতাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলে দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ভবিষ্যতে কারখানা চালু করতে অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হতে পারে।
যমুনা সার কারখানার জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) ফজলুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় আড়াই বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কারখানাটি আবার কবে গ্যাস সংযোগ পাবে—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
কারখানার জেনারেল ম্যানেজার (বাণিজ্যিক) আব্দুল হামীম বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকায় আমাদের সার আমদানি করতে হচ্ছে। কারখানাটি বাফার গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিসিআইসি বাফার গুদামগুলোতে সার সরবরাহ করে থাকে। যমুনা সার কারখানায় আসা সারের চালানপত্রে বাফার গুদাম উল্লেখ করা হয়। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয় নয়।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যদি এটি কেবল একটি উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান হয়, তাহলে চালানপত্রে বারবার ‘বাফার গুদাম’ উল্লেখের প্রয়োজন কেন? উৎপাদন বন্ধ রেখে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের দায় কে নেবে—এ প্রশ্নও উঠছে।
এ বিষয়ে যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আফাজ উদ্দিনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কৃষি ও শিল্প খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা প্রতিবছর বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতাকে অচল রেখে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদে যৌক্তিক হতে পারে না। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে যমুনা সার কারখানাকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে না পারলে রাষ্ট্রকে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে সার আমদানি করতে হবে। আর দেশের অন্যতম বৃহৎ এ শিল্পপ্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে কারখানা থাকলেও বাস্তবে বাফার গুদাম হিসেবেই থেকে যাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


