ত্রিশালের ৪৮ কমিউনিটি ক্লিনিকের বেহাল দশা

চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত পাঁচ লাখ মানুষ

চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত পাঁচ লাখ মানুষ
ত্রিশালের রামপুর কমিউনিটি ক্লিনিক

ময়মনসিংহের ত্রিশালে ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিৎসাসেবায় বেহাল দশা। এসব ক্লিনিক নানা সমস্যায় জর্জরিত হওয়ায় চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। ডাক্তার নেই, ওষুধ সংকট, জরাজীর্ণ ভবন, দরজা-জানালা ভাঙা, রোগীদের মলমূত্র ত্যাগের ব্যবস্থা নেই। এতে করে ১২টি ইউনিয়নের পাঁচ লাখ মানুষ চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হচ্ছেন ।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছিল। দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ থাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকেরই ভয়াবহ অবস্থা। কিন্তু ত্রিশাল উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের অবহেলা, অযত্ন আর নিয়মিত তদারকির কারণে সেই স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের মুখ থুবড়ে পড়েছে। ক্লিনিকগুলোর ভগ্নদশা দেখে মনে হয়, চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বদলে এসব জরাজীর্ণ ভবন এখন জরুরি ‘চিকিৎসা’ বা সংস্কার প্রয়োজন।

ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, ১২টি ইউনিয়নে জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধাপে ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয় ত্রিশালে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিক থেকে গড়ে সাত হাজার মানুষ মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার-পরিকল্পনা, টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি বিষয়ক তথ্য ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ পাওয়ার কথা। ত্রিশাল উপজেলার মঠবাড়ি, বৈলর, কাঁঠাল, কানিহারী ও রামপুর ইউনিয়নে ক্লিনিকের সংখ্যা বেশি। কিন্তু বহু বছর ধরে সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে অধিকাংশ ক্লিনিকই এখন কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা হারিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে।

সরেজমিনে বিভিন্ন ইউনিয়নে দেখা যায়, ৪৮টি ক্লিনিকের বেশিরভাগই বেহাল দশা। অনেক ভবনের ছাদ ও দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে, বৃষ্টির দিনে ছাদ চুইয়ে ভেতরে পানি পড়ে মেঝে ভেসে যায়। কোনো কোনো ভবনের দরজা-জানালা ভেঙে পড়ে গেছে অনেক আগেই। বেশ কিছু ক্লিনিকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, আবার যেখানে আছে সেখানেও ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে ফ্যান ঝুলানো সম্ভব হচ্ছে না। বেশিরভাগ ক্লিনিকে রোগীদের জন্য খাবার পানির কোনো ব্যবস্থা নেই, শৌচাগারগুলো নষ্ট হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। পর্যাপ্ত বসার জায়গা না থাকায় অসুস্থ মানুষ ও গর্ভবতী নারীদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। একই সঙ্গে সরকারিভাবে সরবরাহ করা ওষুধের কার্টনগুলোও জরাজীর্ণ ভবনের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে পড়ে রয়েছে।

কানিহারি বালিদিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা মারজিয়া খাতুন জানান, অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে সেবা নিতে এসেছিলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাচ্চার গায়ে খুব জ্বর, ওষুধ নিতে আসছিলাম। কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই গা ছমছম করে। ছাদ থেকে সিমেন্টের টুকরা খসে খসে শরীরে পড়ছে। বৃষ্টি হলে তো দাঁড়িয়ে থাকার উপায় থাকে না, পানি চুইয়ে গায়ে পড়ে। আমরা গরিব মানুষ, শহরে ডাক্তার দেখানোর টাকা নাই বলে এখানে আসছি। কিন্তু এমন ভাঙা ঘরে ডাক্তার-রোগী দুজনেরই তো প্রাণের ঝুঁকি রয়েছে। তাছাড়া এসেও লাভ হয় না, কারণ গ্যাস্ট্রিক আর প্যারাসিটামল ছাড়া বেশিরভাগ সময় কোনো ওষুধই পাওয়া যায় না। এসে শুনি সাপ্লাই শেষ। বাধ্য হয়ে গ্রামের ফার্মেসি থেকে ধারদেনা করে ওষুধ কিনে নিতে হয়।

মঠবাড়ি ইউনিয়নে চিকিৎসা নিতে আসা মুস্তাফিজ বলেন, আমি চেকআপ করানোর জন্য এসেছিলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি বসার কোনো ভালো জায়গা নাই, শৌচাগার এত নোংরা যে, ব্যবহার করার উপায় নেই। ডাক্তার নেই, প্রতি সপ্তাহে ডাক্তার একদিন আসেন। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী জানান, প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে জেনেও তারা সেবা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সেই সঙ্গে নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় এবং সঠিক সময়ে ওষুধ সরবরাহ না থাকায় রোগীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য কেউ নেই। ক্লিনিকে তালা খোলা থেকে শুরু করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ সবকছিু স্বাস্থ্যকর্মীদের করতে হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা জিয়াউল বারী বলেন, ক্লিনিকগুলোর ওষুধ মূলত ট্রাস্ট থেকে সরবরাহ করা হয়। কার্টন আকারে যা বরাদ্দ পাওয়া যায়, তা শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী বরাদ্দ আসার আগ পর্যন্ত কিছুটা ঘাটতি দেখা দেয়। বর্তমানে ত্রিশালের ৪৮টি ক্লিনিকের মধ্যে প্রায় ৩০-৩২টি ভবনই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব জীর্ণ ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে চাহিদা ও তালিকা পাঠিয়েছি। সংস্কারের জন্য কোনো বরাদ্দ আসে কি না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কাছে আসে না। সরাসরি স্বাস্থ্য হেলথ প্রকৌশল বিভাগে এলে সিলেক্ট করে তারাই কাজগুলো করে থাকে। এ বিষয়ে চার-পাঁচবার প্রতিবেদন পাঠিয়েছি ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন