ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, দাপ্তরিক কাজে দলীয় পরিচয়ের প্রভাব বিস্তার এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় অসন্তোষ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র ও একাধিক সরকারি কর্মকর্তার অভিযোগ, পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী সরদার দাপ্তরিক বৈঠক ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে নিজেকে বিএনপির স্থানীয় নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। সম্প্রতি এক গণমাধ্যমকর্মীকে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা বলে দাবি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
একজন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে তার এমন রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশের অভিযোগ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সাধারণ মানুষ ও সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের অভিযোগ, দলীয় পরিচয়ের প্রভাবের কারণে তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে কিংবা প্রতিকার চাইতে গেলে ইউএনও দুর্ব্যবহার করেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে তাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ তাদের।
উপজেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুর্তজা আলম বলেন, ‘ইউএনও মানুষকে মানুষ মনে করেন না। তার দপ্তরে ঢুকতে দরজায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেলেও চেয়ারে বসা যায় না। দাঁড় করিয়ে রেখে জেরা করেন। টাকা ছাড়া কোনো কাজ করেন না। টাকা পেলে আবার ভালো আচরণ করেন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির এক নেতা জানান, ইউএনও তাদের সঙ্গেও তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ আচরণ করেন। তার আচরণে শিক্ষক সমাজ ক্ষুব্ধ।
স্থানীয় সংবাদকর্মী বাদল হোসেন বলেন, ‘এই ইউএনও সব সময় নিজেকে বিএনপির ক্যাডার ভাবেন। কথায় কথায় মানুষকে জ্ঞান দেন। অথচ আমি যতটা জেনেছি, ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন।’
যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা খয়রাত আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘জাহিদুর এমপি ছাড়া এই ইউএনও কারও সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। আমার সঙ্গেও একাধিকবার খারাপ আচরণ করেছেন।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্যকে সঙ্গে রেখে সার ডিলার নিয়োগ, টিআর-কাবিখা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা লুটপাট করা হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইউএনও দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সহকর্মীদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, কর্মচারীদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করার পাশাপাশি বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত করার হুমকিও দেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিসিএস কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারি অফিসে একটি পেশাদার ও সেবামুখী পরিবেশ থাকার কথা, কিন্তু এখানে এখন ইউএনওর রামরাজত্ব চলছে। অফিসারদের সারাক্ষণ একধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। অফিসার্স ক্লাবে কেউ যান না।’
ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আবু সায়েম বলেন, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না বা রাজনৈতিক পরিচয় দিতে পারেন না। তার অভিযোগ, পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বিধিমালাকে উপেক্ষা করে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ্যে প্রচার করছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার এ ধরনের আচরণ প্রশাসন ও জনগণের মধ্যকার আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পীরগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ, ভুক্তভোগী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ইউএনওর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

