নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা পরিষদের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সানাউল্লাহ নূর বাবুকে দিনের বেলায় বিএনপির মিছিলে হামলা করে প্রকাশ্যে শত শত মানুষের সামনে কুপিয়ে হত্যার ১৬ বছরেও কোনো বিচার হয়নি। ২০১০ সালের ৮ অক্টোবর বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর আগমনকে স্বাগত জানিয়ে বনপাড়া পৌর বিএনপির মিছিলে হামলা করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা।
এ সময় হামলাকারীরা বাবুকে প্রকাশ্যে সাপ পেটানোর মতো নির্দয়ভাবে পিটিয়ে এবং হাত ও পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এসব ঘটনার সময় খুব কাছে থেকে পাঁচছয় জন সাংবাদিক ও ক্যামেরাপার্সন ভিডিওচিত্র ধারণ করেছিলেন। হামলাকারী সন্ত্রাসীরা পরিকল্পনা অনুযায়ী সে সময় ওই সাংবাদিকদের মারপিট করে চারজনের ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়েছিল এবং টিভি ক্যামেরার ক্যাসেট ও ডিজিটাল ক্যামেরার মেমোরি কার্ড খুলে রেখে দিয়েছিল। তবে একজন সাংবাদিক সেখান থেকে ভিডিও চিত্র ধারণ করে ফিরে আসতে সক্ষম হয়।
তার ভিডিও চিত্রেই প্রকাশ হয়েছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেদিন বিএনপির মিছিলে হামলা করে সানাউল্লাহ নূর বাবু কীভাবে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করে। পরের দিন বাবুর স্ত্রী মহুয়া নূর কচি বাদী হয়ে বড়াইগ্রাম থানায় ২৭ জনকে আসামি করে বাবু হত্যার ঘটনায় মামলা করেন। প্রধান আসামি নাটোর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সেই সময় জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বনপাড়া পৌরসভার পরবর্তী সময়ের মেয়র কে এম জাকির হোসেন, তার ভাই যথাক্রমে ২ ও ৩ নম্বর আসামি কে এম জামিল হোসেন ও সেই সময়কার উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি কে এম জিল্লুর রহমান জিন্নাহ, ৪ নম্বর আসামি বনপাড়া পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ন আহ্বায়ক মাঝগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান খোকন মোল্লা, এ ছাড়া আসামি করা হয় আশরাফুল ইসলাম, মোয়াজ্জেম হোসেন বাবলু, মাসুদ সোনার, সৈকত, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম বিকোন, তার ভাই রাসেল ওরফে রাপ্পু ওরফে রাক্কু, সেলিম, হাসেম, বাদশা, হাসেম-২, গৌতম ঘোষ, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম, রিপন সোনার, মালেক, মাহবুব, জনি, আশরাফুল ইসলাম মিঠু, হাবিব, আবদুল মোমিন, বাবলু মোল্লা, লুৎফর রহমান, বাবু ও বনপাড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাককে। এরা সবাই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
পারিবারিক সূত্র জানান, ২০০৪ সালে বনপাড়া পৌরসভার প্রথম নির্বাচনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসেন সানাউল্লাহ নূর বাবুর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়। বাবু পরে মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থিত প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে আবার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার এই বিজয়কে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি।
সেই সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার মাত্র এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আরিফুর রহমানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বাবু উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তারপর থেকেই এলাকায় নিজ দল বিএনপির তৎপরতা বাড়িয়ে চলেছিলেন তিনি। তার ইচ্ছা ছিল সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করা। বাবু সে লক্ষ্যেই কাজ করছিলেন। কিন্তু বাবুর এত জনপ্রিয়তা আওয়ামী লীগ নেতারা সহ্য করতে পারেনি।
২০১০ সালের ৫ মে রাজশাহীর বিভাগীয় সমাবেশে যাওয়ার পথে বনপাড়ায় বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে সংবর্ধনা দেয়ার পরদিনই জাকিরসহ তার সহযোগীরা বাবুকে শাসায়। তারা হুমকি দেয়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বনপাড়ায় অন্য কোনো দলের সমাবেশ হতে দেওয়া হবে না। আর কোনো সমাবেশ করার চেষ্টা করলে সেদিনই হবে বাবুর জীবনের শেষ দিন।
এ ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডিও করেছিলেন বাবু। ২০১০ সালের ৮ অক্টোবর বিএনপি মিছিল বের করলে সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে কে এম জাকির হোসেনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা বাবুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা অতর্কিত পিস্তল, রামদা, চাপাতি, শাবল ও লাঠি দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে, দুই পায়ের রগ কেটে হত্যা করে তৎকালীন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও বনপাড়া পৌর বিএনপির সভাপতি সানাউল্লাহ নূর বাবুকে।
তারপর ক্ষত বিক্ষত নিথর দেহের ওপর উল্লাস করে সন্ত্রাসীরা। রক্তাক্ত অবস্থায় বাবুকে ঘটনাস্থলের পাশেই পাটোয়ারী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ডা. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী নিজে তার হাত পায়ের রোগ কেটে বাবুর মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন।
বাবু হত্যার প্রতিবাদে নাটোরে হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনেও বাধা দেয় সন্ত্রাসীরা। তার মধ্যেই বাবুর বাড়ি ও শোকসভায় ছুটে আসেন বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বাবু হত্যা মামলায় একের পর এক তদন্ত কর্মকর্তা বদলের পর সিআইডি পুলিশের পক্ষ থেকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক অভিযুক্তকে বাদ দিয়ে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়।
এতে মামলার বাদী আদালতে না রাজি আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বাদী মহুয়া নূর কচি মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করায় মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। মহুয়া নূর কচি জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর তিনি মামলার কার্যক্রম পুনরায় চালুর জন্য আবেদন করেছেন। খুব শীঘ্রই মামলার কার্যক্রম শুরু হবে বলে তিনি আশা করেন। তবে উচ্চ আদালতে এই মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার ইউসুফ আলী দেশের বাহিরে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

