বিশাল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার নিকট আত্মীয়, ছাত্রলীগ ক্যাডার মাহমুদুর রহমানকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ে সহকারী পরিচালক (কলেজ) হিসেবে পদায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় রংপুর আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসসহ স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন মহলে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দপ্তরটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফ্যাসিবাদবিরোধী মনোভাবাপন্ন ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের পদায়নের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।
পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপি নেতা হান্নান মিয়া ও মাসুদ করিম জানান, মাহমুদুর রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাতিজা এবং পীরগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র শামীমের খালাতো ভাই।
উল্লেখ্য, সাবেক মেয়র শামীম এবং সজীব ওয়াজেদ জয় আপন চাচাতো-জেঠাতো ভাই। মাহমুদুর রহমান ছাত্রজীবনে থানা ও পরবর্তীতে উপজেলা পর্যায়ে ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। বিসিএস ক্যাডারে যোগদানের পরও তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থেকে বিভিন্ন লোভনীয় পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে দলকে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছেন। এ ধরনের চিহ্নিত সুবিধাবাদীদের উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়া হলে তারা বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে পুনরায় আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করার অপচেষ্টা চালাবে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারমাইকেল কলেজের একাধিক শিক্ষক জানান, ২৭তম বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে যোগদানের পর থেকে মাহমুদুর রহমান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অন্যায্য সুবিধা ভোগ করেছেন। কারমাইকেল কলেজে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত থাকাকালে দলীয় প্রভাবের কারণে তৎকালীন অধ্যক্ষ ও অন্য শিক্ষকরা তার নিকট তটস্থ থাকতেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিনি মাউশি রংপুর অঞ্চলে সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক) হিসেবে যোগদান করেন। তবে সেখানে সুবিধার অপপ্রয়োগ করতে না পেরে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিকে ম্যানেজ করে ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে উপ-বিদ্যালয় পরিদর্শক পদে বদলি হন। বোর্ডে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ঘুষ ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন এবং পীরগঞ্জে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নানা অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থেকে অর্থায়ন করতেন।
শিক্ষকরা আরো অভিযোগ করেন, রংপুর মাউশির কলেজ শাখার এক কর্মকর্তা দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে একসাথে চাকরি করার সুবাদে মাহমুদুর রহমানকে রংপুর মাউশির সহকারী পরিচালক (এডি-কলেজ) পদে নিয়ে আসতে উঠেপড়ে লেগেছেন। বর্তমানে পদায়নের সম্পর্কিত ফাইলটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও সচিবের দপ্তর পার হয়ে শিক্ষা উপদেষ্টার চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তাকে পদায়ন করার আগে তার অতীত কর্মকাণ্ড গভীরভাবে যাচাই করার আহ্বান জানান শিক্ষকরা।
জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক আহ্বায়ক ইমতিয়াজ ইমতি বলেন, জেনেশুনে আর কোনো ফ্যাসিবাদের দোসরকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়োগ দেওয়া ঠিক হবে না। সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার ও আওয়ামী লীগ পৃষ্ঠপোষক মাহমুদুর রহমানকে রংপুর মাউশিতে নিয়োগ দেওয়া হলে এই অঞ্চলে আবারও ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনর্বাসন ঘটবে, যা আমরা মেনে নেব না।
রংপুর মাউশির কলেজ শাখার উপ-পরিচালক কামরুজ্জামান পাইকাড় বলেন, বিতর্কিত কাউকে রংপুর মাউশির কলেজ শাখায় নিয়োগ দেওয়া হলে দপ্তরের পরিবেশ বিনষ্ট হবে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তা ইতিবাচকভাবে নেবেন না।
মাউশি রংপুর অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক গোলাম মাজেদ জানান, আমি ব্যক্তিগতভাবে মাহমুদুর রহমানকে চিনি। তবে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত এমন কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিকে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া হলে সামগ্রিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাহমুদুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফোনে ও ক্ষুদে বার্তা (মেসেজ) পাঠিয়েও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের সাথে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে সমস্ত তথ্য পাঠানো হলে তিনি তা দেখলেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জেডএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

