কুড়িগ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বেড়েছে ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য। সাংবাদিকতার নামে চলছে চাঁদাবাজি। নামসর্বস্ব পত্রিকা, অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুক পেজের নাম ব্যবহার করে বিদ্যালয়ে ঢুকে অনুমতি ছাড়াই ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিব্রত হচ্ছেন। হঠাৎ অসময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার পরিবেশও বিঘ্নিত করা হচ্ছে। অপরিচিত লোকজনের আগমনে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে জেলার কয়েকটি বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকৃত সাংবাদিকেরা নিয়ম মেনে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে দায়িত্বশীলভাবে সংবাদ উপস্থাপন করেন। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, ক্লাস চলাকালে হঠাৎ কয়েকজন লোক সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন নথি দেখতে চান। অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে শিক্ষকদের বিব্রত করেন। যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলের তেল খরচ কিংবা দুপুরের খাবারের জন্য টাকা দাবি করেন। বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ হলে সুনাম ক্ষুণ্ন হবে—এমন আশঙ্কায় অনেক শিক্ষক ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিয়েও দেন।
সম্প্রতি চিলমারীর সোনারীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দুই ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় দেন। অনুমতি ছাড়াই বিদ্যালয়ে ঢুকে প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে বসে নানা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করেন। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য না পেয়ে শেষ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে দুপুরের খাবারের জন্য টাকা দাবি করেন। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজিনা সুলতানা বলেন, “গত কয়েকদিন আগে দুইজন লোক আমার স্কুলে আসে। সাংবাদিক পরিচয়ে আমার চেয়ারে বসে পায়ের ওপর পা তুলে নানা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতে শুরু করে। এরপর যাওয়ার সময় দুপুরের খাবারের কথা বলে টাকা দাবি করে। এসব হয়রানি দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিত।”
সহকারী শিক্ষক খুরশিদা রহমান মনি ও জাকিয়া সিদ্দিকা আইভি বলেন, “ক্লাস চলাকালে তারা স্কুলে এসে সাংবাদিক পরিচয়ে নানা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে। প্রশ্ন শুনেই বোঝা যায়, তারা কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে আসেনি; এসেছে হয়রানি করতে। এরপর টাকা দাবি করে। আমাদের কোনো ভুল পেলে সংবাদ করবে, তাহলে টাকা চাইবে কেন? এটি তো এক ধরনের চাঁদাবাজি।”
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা সভাপতি রওশন আরা বেগম বলেন, “অনেকদিন ধরেই কিছু লোক বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানি করছে। টাকা দাবি করছে। টাকা না দিলে সংবাদ প্রকাশের হুমকি দিচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব হয়রানি দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিকদেরও বিষয়টি নজরদারি করা প্রয়োজন, কারা এসব অপসাংবাদিকতা করছে।”
কুড়িগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্যসচিব মানোয়ার হোসেন লিটন বলেন, “ইদানীং নামধারী কিছু সাংবাদিক অপরিচিত পত্রিকা বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি করছে। এতে প্রকৃত সাংবাদিকদেরও সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সাংবাদিকতার নামে এসব চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে।”
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, “শুধু কুড়িগ্রাম জেলায় নয়, সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেই ভুয়া সাংবাদিকদের হয়রানির ঘটনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। কুড়িগ্রাম জেলায় ইতোমধ্যে কয়েকজন ভুয়া সাংবাদিককে চিহ্নিত করেছি। দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

