পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া টিউলিপ ফুলের বাগানে এখন বইছে বসন্তের আমেজ। দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তের লোকজন বাহারি রঙের এই ফুল দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ ফুল কিনছেন, কেউবা ফুলসহ চারা। পর্যটকদের কাছে ভিনদেশি টিউলিপের বাগান এ অঞ্চল যেন একখণ্ড ‘নেদারল্যান্ডস’।
উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরেখার প্রত্যন্ত গ্রাম দর্জিপাড়া। পর্যটনপ্রেমীদের কাছে এ ফুলের কারণে এখন বিনোদনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই এলাকা। দলে দলে মানুষ আসে নয়নাভিরাম টিউলিপের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে।
দর্জিপাড়ার দুই একর জমিতে ১০ প্রজাতির টিউলিপ ফুলে ভরে গেছে গোটা ভূমি। আর শীতের অতিথি ফুল টিউলিপ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন হাজারো পর্যটক।
পঞ্চগড়ে একটি বেসরকারি সংস্থার ব্যবস্থাপক, শিশু সংগঠক ও পরিবেশকর্মী কবির আকন্দ বলেন, টিউলিপ ফুল মানুষের হৃদয়ে একটা উৎসবের আমেজ সৃষ্টি করেছে।
পঞ্চগড় ভূমিজের পরিচালক, সফল নাট্য গবেষক ও সাংবাদিক সরকার হায়দার বলেন, সমতলের এই চা-অঞ্চলে টিউলিপের আবির্ভাব আমাদের বিমুগ্ধ করেছে। টিউলিপ বাগানে এসে ফুলের গায়ে আলতো হাত বুলাতে গিয়ে হৃদয়ে ছোঁয়া দেয় অন্যরকম এক অনুভূতি।
তেঁতুলিয়ার প্রবীণ সাংবাদিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, টিউলিপ এ অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনসহ নারী উদ্যোক্তাদের স্বাবলম্বী করে তুলেছে। পর্যটকদের কাছে তেঁতুলিয়ার টিউলিপ অঞ্চল যেন একখণ্ড ‘নেদারল্যান্ডস’।
রংপুর থেকে সপরিবারে তেঁতুলিয়া বেড়াতে এসেছেন কানিজ আয়েশা দম্পত্তি। টিউলিপ বাগানের কথা শুনে চলে এসেছেন ফুল দেখতে। তিনি জানান, টিউলিপ বাগান দেখে মনটা ভরে গেল। ফুলের সৌন্দর্যে আমি অভিভূত। শীতের দেশের এই ফুলটি তেঁতুলিয়ায় চাষ হবে—তা কখনো ভাবতে পারিনি। তেঁতুলিয়ায় আমাদের মতো অনেক মানুষ বেড়াতে আসে। শীত মৌসূমে টিউলিপ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
জানা যায়, টিউলিপ ফুল চাষ হয় মূলত নেদারল্যান্ডস, কাশ্মীর, সুইজারল্যান্ড ও তুরস্কে। এছাড়া শীতপ্রধান অনেক দেশেই এখন বাণিজ্যিকভাবে টিউলিপ চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে টিউলিপ বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে।
টিউলিপ ফুল চাষের ক্ষেত্রে দিনের বেলা ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এই ফুল চাষ সহনশীল।
পঞ্চগড়ে শীত মৌসুমে এই মাত্রার তাপমাত্রা থাকায় গত বছর নেদারল্যান্ডস থেকে এ ফুলের বীজ এনে তেঁতুলিয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে এই ফুলের চাষ শুরু করে উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। পরীক্ষামূলক চাষে সাফল্যের পর পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং ইণ্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্টের (ইফাদ) সহযোগিতায় ইএসডিও এ বছর তেঁতুলিয়া সীমান্তবর্তী দর্জিপাড়া গ্রামের ২০ কৃষানিকে দিয়ে দুই একর জমিতে টিউলিপ ফুল চাষ করেছে।
গত জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইএসডিওর নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান ও পরিচালক (প্রশাসন) ড. সেলিমা আখতার টিউলিপ ফুলের বীজ রোপণ উদ্বোধন করেন। ইএসডিওর এ প্রকল্পের আওতায় চাষিরা এখানে ১০ প্রজাতির টিউলিপ চাষ করেছেন। মাত্র ১৬ দিনের পরিচর্যায় ফুলের কলি আসে। ২০-২১ দিনের মধ্যেই ফুল ফুটতে শুরু করে। এই ফুলের বীজ রোপণের দিন হতে ১৮-২০ দিনের মধ্যে কলি আসে এবং ২৫-৬০ দিন পর্যন্ত এই ফুল স্থায়ী থাকে। বীজের পাশাপাশি ইএসডিও চাষিদের প্রকল্প হতে বিনামূল্যে রাসায়নিক সার, জৈবসার, খৈল, শেডনেট এবং ফেন্সিংনেট (বেড়ার জাল) দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চাষিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে ফুল চাষাবাদে উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে।
শারিয়ালজোত গ্রামের কৃষানি সাবিনা পারভীন জানান, আমরা ২০ জন ইএসডিওর সহযোগিতায় দুই একর জমিতে টিউলিপ ফুল চাষ করে আসছি। বীজ বপনের পর নিজেরাই বাগানের পরিচর্যা করছি। প্রতিদিন অনেক পর্যটক আসছেন আমাদের বাগান দেখতে।
বাগানে ঢোকার ফি, চারা ও ফুল বিক্রি করে ভালো আয় হচ্ছে। আমরা লাভবান হলে আগামী মৌসুমে আরো বেশি জমিতে টিউলিপ চাষ করব।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন জানান, সমতলের চা, কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্যসহ প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশের কারণে তেঁতুলিয়া ইতোমধ্যে পর্যটকদের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। পুরো শীত মৌসুমে লাখো পর্যটক আসেন তেঁতুলিয়ায় ঘুরতে। এরই মধ্যে শীতের ফুল টিউলিপ এগ্রি ইকো ট্যুরিজমে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে করে তেঁতুলিয়ায় পর্যটকের সংখ্যা আরো বাড়বে। কৃষি বিভাগ টিউলিপ চাষে সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে আসছে। আশা করছি আগামী মৌসূমে টিউলিপ চাষ আরো বৃদ্ধি পাবে।
ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) পরিচালক (প্রশাসন) ড. সেলিমা আখতার বলেন, তেঁতুলিয়ায় পর্যটকরা আসেন চা-বাগান দেখতে, আসেন কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে। গত কয়েক বছর থেকে তারা আসছেন টিউলিপ ফুল দেখতে। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে বিশ্বের নামকরা অন্য যে ফুলগুলো আছে, সেগুলো তেঁতুলিয়ায় চাষ হবে, যা দেখতে পর্যটকরা সারা বছরই এখানে আসবেন। তিনি বলেন, তেঁতুলিয়াসহ এই অঞ্চলকে সারা বছর বাংলাদেশের দরবারে ভালো কিছু দেখাতে আমরা সচেষ্ট রয়েছি। টিউলিপ চাষ প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক আয়ের নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি পর্যটনশিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


কারখানা বন্ধের ইঁদুর-বিড়াল খেলা, মাসে ক্ষতি ২৩৭ কোটি টাকা