রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ

১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সভাপতির বিরুদ্ধে

১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সভাপতির বিরুদ্ধে

রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক নির্মাণ উপকমিটির আহ্বায়ক ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের আস্থাভাজন এনামুল হক সোহেলের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে আদালতে দুটি মামলা হয়েছে। মামলা চলমান থাকার পরও দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড তাকে গভর্নিং বডির সভাপতি করে নতুন কমিটি অনুমোদন দেওয়ায় ওই কমিটির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেছেন লায়ন্স ক্লাবের সাবেক সভাপতি শহিদুল আনাম তুহিন।

রিট পিটিশন শুনানি ও আদেশের আগেই তড়িঘড়ি করে ২৭ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে প্রায় তিন কোটি ও নির্মাণ ফান্ডসহ চেক জালিয়াতি এবং ভুয়া ভাউচার তৈরি করে ১৫ কোটি টাকা টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় গত ১৮ জুন জেলা প্রশাসক বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন লায়ন্স ক্লাব অব রংপুরের সাবেক সদস্য আখলাকুল ইসলাম তারেক। 

ওই লিখিত অভিযোগ ও স্কুল অ্যান্ড কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দুই বছর গভর্নিং বডিতে থেকে লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের উন্নয়নের নামে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন এনামুল হক সোহেল গং। ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে স্কুলের অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি সিএ ফার্ম, ক্লাব অডিট কমিটি তদন্ত করে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়ে আগের সভাপতি তুহিনের কাছে জমা দেন।

এ ঘটনায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে তৎকালীন সভাপতি আকবর হোসেন, সদস্য সচিব ও স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রায়হান শরীফ, নির্মাণ কমিটির আহ্বায়ক এনামুল হক সোহেল, ক্রয় কমিটির আহ্বায়ক একেএম বানিউল আদম বাবু, সদস্য নাসরিন হক ববি (তিনি এনামুল হক সোহেলের স্ত্রী), স্কুলের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সজল কুমার বিশ্বাস ও সাজ্জাদ হোসেনকে আসামি করে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট রংপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন লায়ন্স ক্লাবের পরিচালক ফরিদ আহমেদ রুমি। আদালতের বিচারক ওই মামলাটি থানায় নথিভুক্ত করতে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশকে নির্দেশ দেন।

এদিকে ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর লায়ন্স ক্লাবের পাসওয়ার্ড ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এনে সাতজনের নামে রংপুরের সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে আরেকটি মামলা করেন লায়ন্স ক্লাবের পরিচালক ফরিদ আহমেদ রুমি। এই মামলায়ও প্রধান আসামি করা হয় নির্মাণ উপকমিটির আহ্বায়ক এনামুল হক সোহেলসহ আরো কয়েকজনকে।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর তৎকালীন কমিটির বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে তদন্ত চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেন লায়ন্স ক্লাবের সাবেক সভাপতি শহিদুল আনাম তুহিন। সেই অভিযোগের আলোকে ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর শিক্ষা বোর্ড থেকে তদন্তের লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

কমিটি তদন্ত শেষ না করতেই অর্থ আত্মসাতের মামলার ৩ নম্বর আসামি এনামুল হক সোহেলকে গভর্নিং বডির সভাপতি করে নতুন কমিটি অনুমোদন দেয় শিক্ষা বোর্ড। অভিযোগ রয়েছে, এনামুল হক সোহেল সভাপতির দায়িত্ব পেয়েই মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতে তার পছন্দের ২৭ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়েছেন।

তবে এই নিয়োগের বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেক প্রার্থী বলেন যে, লায়ন্সের নিয়োগ পরীক্ষায় মেধার মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রভাষক পদে যারা ১৫ লাখ, সহকারী শিক্ষক পদে ১০ লাখ এবং অন্যান্য পদে আট লাখ টাকা দিয়েছেন তাদের চাকরি হয়েছে। পরীক্ষায় নির্ধারিত নম্বরের ৬০ শতাংশ মৌখিক ও প্রদর্শনী ক্লাসের জন্য এবং ৪০ শতাংশ লিখিত পরীক্ষার জন্য রাখা হয়, যা অনিয়মের একটি চরম দৃষ্টান্ত।

কয়েকজন শিক্ষক এবং স্কুল কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, এনামুল হক সোহেল এবং তার স্ত্রী ক্লাবের সভাপতি নাসরিন হক ববি খুব চালাক। যখন যারা ক্ষমতায় আসে তাদের পেছনেই তারা লেগে থাকেন। সেই দলের নেতাদের খুশি করতে যা করার তাই তারা করে নিজেদের ফায়দা হাসিল করেন। এনামুল হক সোহেল এবং ক্লাবের সভাপতি তার স্ত্রীর অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলায় স্বামী-স্ত্রী মিলে নিয়মবহির্ভূতভাবে পর্যায়ক্রমে ২৯ জন সদস্যকে ক্লাব থেকে বহিষ্কার করেন। তারা পেশিশক্তি ব্যবহার করে ক্লাব এবং স্কুল অ্যান্ড কলেজ দখল করে সরকারি খাস জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। ভবনটি প্ল্যান-বহির্ভূত হওয়ার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন স্কুলের শুভাকাঙ্ক্ষী ও কমিটির অধিকাংশ সদস্য।

তারা আরো বলেন, বর্তমান সভাপতি এনামুল হক সোহেল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ উপেক্ষা করে টেন্ডার ছাড়া চার কোটি ৮৮ লাখ ২১ হাজার ৪৬২ টাকার কাজ করেছেন। তিনি নির্মাণ উপকমিটির নামে চেক না নিয়ে নিজ নামে ২২টি চেক গ্রহণ করেছেন। নবনির্মিত ভবনের কোনো নকশা বা ওয়ার্ক এস্টিমেট না করে, এনামুল হক সোহেলের নামে ইস্যু করা চার কোটি ৮৮ লাখ ২১ হাজার ৪৬২ টাকার মধ্যে ভুয়া বিলে ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৬২ টাকা গ্রহণ করেছেন। তিনি ২০২২ সালে পিডব্লিউডির রেট শিডিউল মোতাবেক বিল গ্রহণ করেছেন। এখানে সরকারের অংশ ভ্যাট ও ট্যাক্স ১৪ শতাংশ এবং ঠিকাদার প্রফিট ১০ শতাংশ তিনি আত্মসাৎ করেছেন। সে অনুযায়ী ভ্যাট ও ট্যাক্সবাবদ প্রায় ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং ঠিকাদার প্রফিট ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪৬ টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন।

ক্লাবের সদস্যরা জানান, লিফট ক্রয়ে দরপত্র আহ্বান করা হলে আটটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করেন। সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে সর্বোচ্চ দরদাতাকে কার্যাদেশ দেন। লায়ন এনামুল হক সোহেল তার নিজ নামে লিফট সাপ্লাই বিল বাবদ চারটি চেক গ্রহণ করেন।

এনামুল হক সোহেল গত দুই বছরে ২৪ কোটি টাকা খরচ করেছেন, যেখানে ছয় কোটি ৬৩ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯৭ টাকা বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় দেখানো হয়।

এছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন হওয়ার জন্য লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফান্ডের টাকা দিয়ে বহুতল ভবনের নিচে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল স্থাপন করা হয় (যা বর্তমানে ইট গেঁথে বন্ধ রাখা হয়েছে)। বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে এমন কাজ করেছে বলে নজির নেই।

লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফান্ড থেকে অজ্ঞাত মো. জিয়াউল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে ২০২২ সালের ১৯ অক্টোবরে ঢাকা ব্যাংকের রংপুর শাখার চেক নম্বর ১০৭৫৮৩৮ মূলে এক কোটি ৪৯ লাখ ৫০০ টাকা দেওয়া হয়। কী কারণে এই টাকা দেওয়া হয়েছে তার সঠিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইনামুল হাসান রোজেন আমার দেশকে বলেন, ‘মামলা চলমান থাকার পরও শিক্ষা বোর্ড এনামুল হক সোহেলকে সভাপতি করে ম্যানেজিং কমিটি দিয়েছে। স্কুলটি যেহেতু লায়ন্স ক্লাব পরিচালিত, এক্ষেত্রে কিছু নিয়মকানুন রয়েছে। তাই হয়তো শিক্ষা বোর্ড এনামুল সাহেবকে ম্যানেজ করে সভাপতি বানিয়েছেন।’

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত স্কুল অ্যান্ড কলেজে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এনামুল হক সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘নিউজ কেন করবেন? এগুলো নিয়ে তো মামলা চলমান। মামলা চলা অবস্থায় কি পত্রিকার সংবাদ করা ঠিক হবে? বরঞ্চ আপনি আমার সঙ্গে দেখা করেন, তখন বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা যাবে’ বলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে তিনি ফোন করে জানান যে, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিপক্ষে তার কাছে সব ডকুমেন্ট রয়েছে, সেগুলো তিনি কোর্টে দাখিল করবেন।

এ বিষয়ে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নতুন তাই লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগটি এখনো আমার হাতে আসেনি। আগামীকাল সকালে অফিসে গিয়ে বিষয়টির খোঁজ নেব।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রংপুর সিআইডির ইন্সপেক্টর মো. শরিফুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের মামলা আমি নিখুঁতভাবে তদন্ত করছি, আমি যা সঠিক পাব সেটাই আদালতে দাখিল করব বলে তিনি জানান।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন