উপকারী এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে রাসায়নিক কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ছাড়াই বেগুন ও ঢেঁড়স চাষে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হক।
নিজস্ব গবেষণাগারে পৃথক করা উপকারী এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে এমন সাফল্য অর্জন করেছে হাবিপ্রবির গবেষকরা। এতে সহযোগিতা করেছে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স প্রকল্প।
এর আগে একই পদ্ধতিতে আলু চাষে সফলতা অর্জন করেছেন হাবিপ্রবির বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হকের নেতৃত্বে গবেষকরা।
হাবিপ্রবির গবেষক দলের তথ্য অনুযায়ী, একই কৃষিজমিতে প্রায় চার বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এসব ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করা হয়েছে। এ সময়ে পরীক্ষাধীন জমিতে নাইট্রোজেন ও ফসফরাসের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নতি এবং প্রচলিত ব্যবস্থাপনার তুলনায় কম ইউরিয়া ও টিএসপি সার ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখা গেছে। উল্লিখিত জমিতে রাসায়নিক কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করা হয়নি বলে জানিয়েছে গবেষক দলটি।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ হলো, বর্ষা মৌসুমে নিচু জমিতেও বেগুন ও ঢেঁড়সের সফল চাষ করা হয়েছে। গবেষক দলের ভাষ্য
অনুযায়ী, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও মাটির উচ্চ আর্দ্রতার মধ্যেও গাছে ভাইরাসজনিত রোগ বা ঢলে পড়ার দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা যায়নি;
উল্লেখযোগ্য পোকামাকড়ের আক্রমণও পাওয়া যায়নি। তবে রোগজীবাণুর সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করা হয়নি।
দেশীয় উৎপাদনযন্ত্র, শিল্পসম্ভাবনা ও ব্র্যাকের সহযোগিতায় বাংলাদেশে উপকারী এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক তরল জৈবসার উৎপাদনের জন্য বিশেষায়িত যন্ত্র উদ্ভাবনের অন্যতম অগ্রণী দেশীয় উদ্যোগ এটি।
অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হকের উদ্ভাবিত তাপমাত্রা ও ঘূর্ণন নিয়ন্ত্রিত বায়োগ্রোথ চেম্বারের প্রযুক্তির যুক্তরাষ্ট্রে পেটেন্ট মঞ্জুর হয়েছে; বাংলাদেশে এ-সংক্রান্ত পেটেন্ট আবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পেটেন্ট নথি ও প্রকাশিত গবেষণা প্রযুক্তিটির স্বতন্ত্র নকশা এবং দেশীয় উদ্ভাবনের প্রামাণ্য ভিত্তি তৈরি করেছে।
গবেষক দলের মতে, প্রযুক্তিটি উৎপাদনের মান, জীবাণুর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার মানদণ্ড পূরণ করে শিল্পপর্যায়ে সম্প্রসারণ করা গেলে দেশে তরল জৈব বালাইনাশক প্রস্তুতের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে আমদানিনির্ভরতা এবং রাসায়নিক উপকরণের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। গবেষণাটির মাঠপর্যায়ের অগ্রগতিতে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেছে বলে জানিয়েছে গবেষক দল। ভবিষ্যতে ব্র্যাক সিড অ্যান্ড অ্যাগ্রোসহ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারদের মাধ্যমে উৎপাদন ও কৃষকপর্যায়ে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
চার বছরের প্রয়োগে মাটির জৈবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা এই গবেষণার বিশেষ দিক হলো একই জমিতে দীর্ঘদিন উপকারী ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করে মাটির জীববৈচিত্র্য ও পুষ্টিচক্রের কার্যকারিতা উন্নত করার চেষ্টা।
মাটির অণুজীবসমাজকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবস্থাপনার এই ধারণা ‘সয়েল মাইক্রোবায়োম ইঞ্জিনিয়ারিং’ ( Soil Microbiome Engineering) নামে পরিচিত। উপকারী অণুজীব উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণ ও বৃদ্ধি সহায়তা করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে রোগের চাপ কমাতেও ভূমিকা রাখে।
গবেষকদের ধারণা, ধারাবাহিক প্রয়োগে মাটির অণুজীবসমাজে অনুকূল পরিবর্তন ঘটতে পারে। তবে এ জমিতে স্থায়ী মাইক্রোবায়োম পরিবর্তন হয়েছে এবং তার কারণেই রোগের লক্ষণ কমেছে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছা পৌঁছতে মেটাজিনোমিক বিশ্লেষণ, উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ জমি ও একাধিক মৌসুমের তুলনামূলক পরীক্ষা প্রয়োজন।
খাদ্যনিরাপত্তা ও নিরাপদ কৃষিতে সম্ভাব্য ভূমিকা
বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদা, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যে কম রাসায়নিক উপকরণ ব্যবহার করে নির্ভরযোগ্য ফলন নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
দেশীয় উপকারী অণুজীব ও উৎপাদনপ্রযুক্তি এই লক্ষ্যে সহায়ক হতে পারে, তবে একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্রের ফলকে দেশব্যাপী নিশ্চিত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
বিভিন্ন অঞ্চল ও মৌসুমে কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে প্রযুক্তিটি কৃষকের ব্যয় কমানো, রাসায়নিক বালাইনাশকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার হ্রাস এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বর্ষাকালে নিচু জমিতে সবজি চাষের অভিজ্ঞতা জলবায়ু সহনশীল কৃষি গবেষণায় নতুন দিক উন্মোচন করেছে।
তবে কোনো ক্ষেত্রেই পরীক্ষিত ও অনুমোদিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া নির্বিচারে কীটনাশক বন্ধ করার সুপারিশ করা হচ্ছে না; রোগ-পোকা পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষামূলক কর্মসূচির প্রস্তাব
এই উদ্যোগের সম্ভাবনা মূল্যায়নে কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বয়ে ‘জাতীয় মৃত্তিকা মাইক্রোবায়োম ব্যবস্থাপনা ও জৈবিক ফসল সুরক্ষা’ পরীক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণের প্রস্তাব করা যেতে পারে।
এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রিত মাঠপরীক্ষা, ফসলের ফলন ও রোগবালাই পরিমাপ, মাটির নাইট্রোজেন- ফসফরাস ও অণুজীবসমাজের পরিবর্তন নিরীক্ষা, জীবাণুর নিরাপত্তা যাচাই এবং তরল জৈবসারের নিবন্ধন ও মাননিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্র্যাক এবং কৃষি উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় কার্যকর ও নিরাপদ প্রযুক্তি শিল্পপর্যায়ে উৎপাদনের পথ খুলতে পারে। কৃষির ভবিষ্যৎ শুধু বেশি সার ও কীটনাশক প্রয়োগে নয়; মাটির উপকারী অণুজীবকে বৈজ্ঞানিকভাবে কাজে লাগিয়েও সাশ্রয়ী ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
হাবিপ্রবির গবেষক অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হক জানান, চার বছরের মাঠপর্যায়ের গবেষণা এবং দেশীয় উৎপাদনযন্ত্র সম্ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। স্বাধীন বৈজ্ঞানিক যাচাই, নীতিগত সহায়তা ও দায়িত্বশীল বাণিজ্যিকীকরণ নিশ্চিত হলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, খাদ্য সুরক্ষা এবং টেকসই কৃষিতে কার্যকর অবদান রাখতে পারে এমন মত ব্যক্ত করেছেন হাবিপ্রবির এই গবেষক।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

-206f66-720x405.webp)