সুনামগঞ্জে চায়না দুয়ারীর দাপটে বিপাকে সরকারি জলমহালের ইজারাদারেরা

সুনামগঞ্জে চায়না দুয়ারীর দাপটে বিপাকে সরকারি জলমহালের ইজারাদারেরা

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জালের (রিং জাল) অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে আশঙ্কাজনক হারে কমছে দেশীয় মাছ। সরকারি জলমহালগুলোতেও অবাধে চলছে মাছ নিধনের মহোৎসব। বারবার অভিযোগ করেও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না পাওয়ায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছেন জলমহালের ইজারাদারেরা।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে ভোরে থলেরবন্দ কৈয়া-বনুয়া বিলে (বদ্ধ জলমহাল) গিয়ে দেখা যায়, শত শত চায়না দুয়ারী, নেটের বাঁধ ও কারেন্ট জাল ফেলে মাছ ধরা হচ্ছে। ইজারাগ্রহীতা সমিতির সদস্যরা এতে বাধা দিতে গেলে উল্টো তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না।

জানা গেছে, স্মারক নং ১২৯-এর অধীনে ১৪৩০ থেকে ১৪৩৫ বাংলা সন পর্যন্ত বিলটি ‘থলেরবন্দ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের নামে ইজারা দেওয়া হয়। ইজারা নেওয়ার পর থেকে প্রতি বছর সমিতি সরকারি শর্ত মেনে প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন প্রজাতির পোনা অবমুক্ত করে এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখে। বিলের ভেতর একটি অভয়াশ্রম ও একটি বিল নার্সারিও গড়ে তোলা হয়েছে। তবে নিষিদ্ধ জালের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে বড় মাছের পাশাপাশি পোনা, ডিমওয়ালা মাছ ও নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, এ সমস্যা বেশ পুরোনো। ২০২০ সালে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিলে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেবুন নাহার শাম্মী তদন্তে সত্যতা পেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো সমাধান পাননি ইজারাদাররা। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর দুবার এবং সর্বশেষ গত ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সমিতি আবারও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করে।

থলেরবন্দ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আমীন বলেন, রিং জাল ও অবৈধ বাঁধের মাধ্যমে মাছ ধরার কারণে প্রতি বছর আমাদের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। গত বছর আগাম বৃষ্টির কারণে সময়মতো মাছ আহরণ করতে না পারায় খাজনা শোধ করতে ঋণ নিতে হয়েছে। চলতি বছরও বিভিন্ন পয়েন্টে মাছ ধরতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ছি। বিলে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এবারও খাজনা দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আমরা সরকারি সব বিধি মেনে বিল পরিচালনা করছি, কিন্তু বার বারবার প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার মিলছে না।

সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ মকবুল হোসেন বলেন, কৈয়া ও বনুয়া বিল উন্নয়ন স্কিমে একটি প্রভাবশালী চক্র চায়না দুয়ারী, নেট, কারেন্ট জাল এবং বিভিন্ন পয়েন্টে বাঁধ দিয়ে অবৈধভাবে মাছ তুলে নিচ্ছে। এতে প্রতি বছর সমিতির অন্তত ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। অবৈধ জাল ও বাঁধ অপসারণসহ বিলের মাছ ও মৎস্যজীবীদের জীবিকা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

একই কথা জানান সমিতির সদস্য মোহাম্মদ সামির হোসেন। তিনি বলেন, অবৈধ জালের কারণে আমাদের বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বারবার অভিযোগ ও মামলা করেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সমিতির সাবেক সভাপতি আমিরুদ্দিন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বিলটি খনন করে মাছ চাষের উপযোগী করতে আমরা অনেক কষ্ট করেছি। কিন্তু মাছ বড় হলে একশ্রেণির লোক বাঁধ দিয়ে সব মাছ ধরে নিয়ে যায়। চলতি বছরেই আমাদের প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কার্যকর সুরাহা মিলছে না।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিল্লোল চাকমা বলেন, সমিতির লিখিত অভিযোগ পেয়েছি এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। অবৈধ ব্যবহারকারীদের সাত দিনের সময় বেধে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নিষিদ্ধ জাল ও বাঁধ ব্যবহার বন্ধ না করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন