ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব গ্রাহকদের কল্যাণে ‘গ্রাহক কল্যাণ তহবিল’ নামে একটি তহবিল পরিচালনা করে থাকে। গ্রাহকদের কাছে বিতরণকৃত ঋণের একটি অংশ দিয়ে এ তহবিল গঠন করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকার কারণে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো তহবিলের জন্য অর্থ আদায় করে আসছে। আবার গ্রাহকদের কল্যাণে ব্যবহার না করে খেলাপি ঋণ সমন্বয় কিংবা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তহবিলের অর্থ ব্যবহার করছে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। উপরন্তু গ্রাহকদের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্নতার কারণে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) ‘ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক কল্যাণ তহবিল গঠন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারসংক্রান্ত বিধিমালা-২০২৬’ নামে একটি বিধিমালা জারি করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিধিমালাটির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিতব্য এমআরএর বোর্ড সভায় এটি চূড়ান্ত অনুমোদন হওয়ার কথা রয়েছে।
মূলত গ্রাহকের মৃত্যুর ক্ষেত্রে দ্রুত আর্থিক সহায়তা প্রদান, ঋণের দায় থেকে অব্যাহতি ও সঞ্চয় ফেরতের পাশাপাশি আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে কল্যাণ তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে ক্ষু্দ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিধিমালা প্রণয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, তহবিল গঠন, তহবিলের ব্যবহারসহ সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে বিধিমালা তৈরি করছি। এর ফলে তহবিলসংক্রান্ত বিষয়গুলো একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আসবে। আগামী অক্টোবর মাসে বিধিমালাটি জারি হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্রাহকদের কাছে বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে সর্বোচ্চ ০.৬ শতাংশ হারে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে এ তহবিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে বিধিমালায়। বর্তমানে কোনো কোনো ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠান বিতরণকৃত ঋণের এক থেকে দুই শতাংশ অর্থ তহবিলের জন্য আদায় করে আসছে। বিধিমালায় অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। তহবিলের জন্য সংগৃহীত অর্থ প্রতিষ্ঠানের সাধারণ জমার সঙ্গে না রেখে সম্পূর্ণ পৃথকভাবে হিসাবায়ন ও সংরক্ষণ করতে হবে। ঋণ গ্রহণের সময়ই গ্রাহককে তহবিলের পরিমাণ, উদ্দেশ্য এবং প্রাপ্য সুবিধা সম্পর্কে লিখিতভাবে অবহিত করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
গঠিত তহবিল থেকে গ্রাহক ও পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ব্যক্তির মৃত্যুজনিত কারণে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে বিধিমালায়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঋণ মওকুফ সুবিধা। বিধিমালায় বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতা, অভিভাবক, মনোনীত ব্যক্তি বা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীর মৃত্যু হলে সার্ভিস চার্জ ব্যতীত অবশিষ্ট মূল ঋণ মওকুফ করতে হবে এবং মৃত্যুর পর আর কোনো সুদ বা চার্জ দাবি করা যাবে না। একইসঙ্গে মৃত গ্রাহকের জমা রাখা ফেরতযোগ্য সঞ্চয় মুনাফাসহ তার বৈধ নমিনি বা দেশীয় উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী উপযুক্ত উত্তরসূরিকে সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
এদিকে গ্রাহক বা তার পরিবারের নির্দিষ্ট ব্যক্তির দাফন বা সৎকারের জন্য তহবিল থেকে এককালীন ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করার বিষয়টি খসড়া বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে। তবে চূড়ান্ত বিধিমালায় এটি কমিয়ে পাঁচ হাজার টাকা করা হতে পারে বলে এমআরএ সূত্রে জানা গেছে। দাফন সহায়তা তৎক্ষণাৎ অথবা সম্ভাব্য সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রদান করতে হবে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, গ্রাহক তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে গ্রাহকের দাবি মেটাতে হবে, যা সামাজিক খাতের ব্যয় হিসেবে গণ্য হবে এবং পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে।
তহবিলের অর্থ কেবল গ্রাহকের মৃত্যু, গুরুতর আঘাত, জটিল রোগ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান থাকা সংক্রান্ত দাবি পূরণে ব্যবহার করা যাবে। তহবিলের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, ঋণের বকেয়া সমন্বয়, লোকসান পূরণ বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনসাপেক্ষে এই অর্থ কেবল ক্ষুদ্রঋণ বিতরণে বা নিরাপদ ব্যাংক/আর্থিক মাধ্যমে সংরক্ষণ বা বিনিয়োগ করা যাবে। তহবিলের অর্থকে প্রতিষ্ঠানের আয় হিসেবে দেখানো যাবে না এবং নির্ধারিত খাতের বাইরে স্থানান্তর বা ব্যবহার করা যাবে না বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।
তহবিলের তথ্য ও স্থিতি পৃথকভাবে আর্থিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করতে হবে এবং প্রতি বছর নিবন্ধিত বহির্নিরীক্ষক দ্বারা হিসাব নিরীক্ষা করাতে হবে।
তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ, অপব্যবহার বা অনিয়ম করা হলে প্রচলিত আইন ও এমআরএর নির্দেশনা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বিধিমালায় বলা হয়েছে।
এমআরএ পরিচালক আবদুল মান্নান আমার দেশকে বলেন, বিধিমালা না থাকার কারণে তহবিলের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দেয়। তহবিলের অর্থে গ্রাহকের খেলাপি ঋণ সমন্বয় কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় কিংবা গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত না দেওয়াসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে তহবিল পরিচালনা করে আসায় এতে নানা ধরনের ব্যত্যয় হচ্ছিল। এ কারণে এমআরএ সব ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানকে একই নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



