জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে ভোগান্তির যেন শেষ নেই। রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে হতাশা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন রাইড শেয়ারকারীরা। তাদের অনেকে যাত্রী পরিবহন করতে না পারায় উপার্জন বন্ধ রয়েছে। আবার অনেকে তেলের বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত গাড়ি বের না করে মেট্রোরেলে চলাচল করছেন। এতে মেট্রোরেলে যাত্রীর চাপ অনেক বেড়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, তেলের জন্য পাম্পের সামনে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের পৃথক দীর্ঘ লাইন। কোনো কোনো পাম্পে লাইন প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়েছে। ভোগান্তি কমাতে অনেকে পাম্প খোলার আগেই লাইন ধরছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইনও দীর্ঘ হয়। নির্ধারিত পরিমাণে দেওয়া হলেও অনেক পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় লাইনে থেকেও পাচ্ছেন না অনেকে। তাদের একরাশ হতাশা নিয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়, ক্ষোভ ঝাড়তেও দেখা গেছে।
পরীবাগে মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য লাইনে থাকা মোটরসাইকেলচালক ইউসুফ আলীর চোখমুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাইড শেয়ার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। একাধিক পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। এর আগে দুটি পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাননি। পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় লাইনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও হতাশা নিয়ে ফিরতে হয়েছে।
ইউসুফ আলীর সঙ্গে কথা বলার মাঝেই লাইনের আগে-পরে থাকা আরো কয়েকজন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানালেন। তারা বলছিলেন, প্রতিটি পাম্পে শত শত মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার লাইনে তেলের জন্য অপেক্ষা করছে প্রতিদিন। বিভিন্ন পাম্পে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাননি। তেল ছাড়া চাকা ঘুরছে না, যাত্রী পরিবহনও হচ্ছে না। ফলে উপার্জনও বন্ধ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সংসারে। সে কারণে এক পাম্পে না পেয়ে অন্য পাম্পে তেলের জন্য ছুটছেন।
একাধিক পেট্রোল পাম্প মালিক জানিয়েছেন, তারা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। ফলে অনেকে লাইনে দাঁড়ালেও তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় দিতে পারছেন না। এক্ষেত্রে তাদের কিছুই করার নেই।
মতিঝিলের কারিম ফিলিং স্টেশনের মালিক আব্দুস সালাম বলেন, আগে ১৩ হাজার লিটার অকটেন পেলেও এখন পাচ্ছেন সাড়ে চার হাজার লিটার। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ায় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে তেল পাচ্ছেন না।
তেলের সরবরাহ না থাকায় অনেক পেট্রোল পাম্প বন্ধ দেখা গেছে। বন্ধ পাম্পগুলোয় সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। পাম্পকর্মীদের অলস সময় পার করতে দেখা যায়।
শেওড়াপাড়ার পেট্রোল পাম্পের এক কর্মী বলেন, তেল থাকলে দীর্ঘ লাইন থাকে, আমাদের ব্যস্ততাও থাকে। তেল নেই, গাড়ির লাইন নেই, আমাদের ব্যস্ততাও নেই। লাইন থাকার পরও অনেকে গাড়ি থামিয়ে তেল পাওয়া যাবে কি না, জানতে চান। উত্তরে বিরক্ত হয়ে বলতে হয়—তেল নেই।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, যেখানে পাম্প, সেখানেই যানজট। বিশেষ করে যেসব পাম্প চালু আছে, সেগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের পৃথক দীর্ঘ লাইন থাকায় সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আবার লাইন দীর্ঘ হওয়ায় দাঁড়ালেও শেষ পর্যন্ত তেল মিলবে কি না, তা জানতে পাম্পের সামনে ভিড় করতে দেখা যায় অনেককে। এতে পাম্পকেন্দ্রিক যানবাহনের জটলা লেগে যায়। তাতে সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।
বিভিন্ন পাম্পে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে নিজেদের মধ্যে, লাইন ছাড়া তেল নিতে আসা চালকদের সঙ্গে লাইন ধরা চালকদের আবার কখনো পাম্পকর্মীদের সঙ্গে তেল নিতে আসা চালকদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকটি পাম্পের কর্মী ও অপেক্ষমাণ চালকরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ লাইন থাকায় বাইরে থেকে কেউ কেউ তেল নিতে পাম্পে প্রবেশের চেষ্টা করলেও হুলুস্থুল লেগে যাচ্ছে। এমনকি হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনাও ঘটছে। তিনটি পাম্পে একাধিকবার লাইনে দাঁড়ানো গাড়িচালকদের মধ্যে, লাইন ছাড়া তেল নিতে আসা লোকদের সঙ্গে পাম্পের কর্মীদের মারামারির ঘটনা ঘটে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে মতিঝিলের কারিম ফিলিং স্টেশন ও আরামবাগের মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনে। অন্যান্য পেট্রোল পাম্পেও লাইন ছাড়া তেল নিতে আসা চালকদের সরিয়ে দিতে দেখা যায় পুলিশ সদস্যদের।
কারিম ফিলিং স্টেশনের মালিক আব্দুস সালাম জানান, তার পাম্পে তিনবার মারামারির ঘটনা ঘটায় পুলিশ সদস্যরা শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করছেন।
এদিকে, আধুনিক বিকল্প গণপরিবহন হিসেবে মেট্রোরেলে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। জানা গেছে, তেল নিতে পেট্রোল পাম্পের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থেকে এই ভ্যাপসা গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার ভোগান্তি থেকে বাঁচতে অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল বের করছেন না। তারা বিকল্প হিসেবে মেট্রোরেলে যাতায়াত করায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
বেশ কয়েকজন যাত্রী জানিয়েছেন, তেল নিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তারপরও অনেক সময় নির্ধারিত পরিমাণ তেল পাওয়া যায় না। এতে যানবাহনটি আটকে থাকছে, সময়ের অপচয় হচ্ছে। তারপর আবার এই ভ্যাপসা গরমে তেল নিতে গিয়ে রীতিমতো ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ ভোগান্তি এড়াতে তারা গাড়ি বা মোটরসাইকেল বের করছেন না। বিকল্প বাহন হিসেবে মেট্রোরেল বেছে নিয়েছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

