আয়-ব্যয়ের ফারাক বাড়ছেই

সংসার চালাতে হিমশিম নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

সংসার চালাতে হিমশিম নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে, কিন্তু সে তুলনায় বাড়ছে না মানুষের আয়। মাসের শুরুতে সংসারের খরচ মেটানোর যে হিসাব কষেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা, মাস শেষ হওয়ার আগেই তা ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, সবজি ও মাছ-মাংসের পেছনে আয়ের বড় অংশ চলে যাওয়ায় সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত ও ভবিষ্যতের সঞ্চয়ে টান পড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরছে না; বরং আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকায় সংসার চালানোই অনেক পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা জুবায়ের আহমেদ আমার দেশকে বলেন, কয়েক মাস আগেও মাসের বাজারে আট থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন একই ধরনের কেনাকাটায় ব্যয় হচ্ছে ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা। অথচ গত দুই বছরে বেতন বাড়েনি। এর সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে প্রতি মাসেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। শহরের বাইরেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। গ্রামের মানুষের আয় তেমন না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ ও কৃষকদের পক্ষে সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত জুনে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। জুলাইয়ে তা কমে ৮.৩২ শতাংশ এবং আগস্টে ৮.২৬ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে সেপ্টেম্বরে আবার বেড়ে হয় ৮.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ দুই মাস কিছুটা নিম্নমুখী থাকার পর মূল্যস্ফীতির হার ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিই সাম্প্রতিক এই চাপের অন্যতম কারণ। বিবিএসের তথ্যমতে, আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭.০২ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭.২২ শতাংশে। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আগস্টের ৯.৩২ শতাংশ থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ৯.৩০ শতাংশ হয়েছে। তবে এই হারও তুলনামূলকভাবে উচ্চ।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার কমলেও বাজারে পণ্যের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে না। গত বছর এক কেজি চালের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা হলে বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ১০ শতাংশ। পরের বছর সেটি ৬৬ টাকা থেকে ৬৯ টাকা হলে দাম আবার বাড়ে। যদিও বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কম। ফলে পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কম দেখালেও ভোক্তাকে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ছে দ্রুত

পরিবারগুলোর সংকট আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মজুরি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, মূল্যস্ফীতি বাড়লেও একই সময়ে কমেছে মজুরি বৃদ্ধির হার। সেপ্টেম্বরে সাধারণ মজুরি সূচক কমে ৭.৯০ শতাংশ হয়, আগের মাসে যা ছিল ৮.০৫ শতাংশ। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮.২২ শতাংশ। আয় কমে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ফলে সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বিপাকে পড়েছে। সেপ্টেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৮.৩৪ শতাংশে। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০.৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।

সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য বাজারে পৌঁছানোর খরচ বৃদ্ধি পায়। উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহের প্রতিটি পর্যায়ে ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে। আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়হার, বন্দর ব্যয় এবং পরিবহন খরচও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সঞ্চয় হারিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন মধ্যবিত্তরা। সীমিত আয়ের কারণে তারা যেমন বাড়তি ব্যয় সহজে বহন করতে পারছেন না, তেমনি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য থাকা বিভিন্ন সহায়তার আওতায়ও সাধারণত পড়েন না। মাসের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে প্রথমে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, পরে ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেককে। এতে জরুরি চিকিৎসা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা কিংবা ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেলে মানুষের প্রকৃত আয় সংকুচিত হয়। এতে ক্রয়ক্ষমতা কমার পাশাপাশি দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাবার কেনায় ব্যয় হয়, তাদের ওপর চাপ তুলনামূলক বেশি পড়ে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...