দেশের কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) অর্থায়নের অন্যতম লক্ষ্য উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, কিন্তু সে লক্ষ্য থেকে সরে সিএমএসএমই ঋণের বড় অংশ চলে যাচ্ছে বাণিজ্য খাতে। ফলে এ খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছরের মার্চ শেষে সিএমএসএমই ঋণের ৪৪ দশমিক ৯৩ শতাংশই গেছে বাণিজ্য খাতে। বিপরীতে উৎপাদন খাতে গেছে ৩৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ আর সেবা খাতে ২০ শতাংশ।
অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, সিএমএসএমই ঋণের অন্তত ৪০ শতাংশ উৎপাদন খাতে যাওয়ার কথা। আর বাণিজ্য খাতে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ শতাংশ। কিন্তু উৎপাদন খাতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঋণ প্রায় ৫ শতাংশ কম গেছে, সেখানে বাণিজ্য খাতে ঋণের অংশ নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় পাঁচ শতাংশ বেশি। এর মধ্য দিয়ে সিএমএসএমই অর্থায়নের কাঠামো উৎপাদনের পরিবর্তে বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, ব্যাংকগুলো মূলত ক্রেডিট রিস্ক বিবেচনা করে ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক খাতে ঋণ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ এসব ব্যবসায় ঋণ ফেরতের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে সহজে মূল্যায়ন করা যায়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য হলো, বাণিজ্য খাতে ঋণের অংশ কমিয়ে উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে অর্থায়ন বাড়ানো।
তিনি জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্পের জন্য আলাদা ফান্ডের সার্কুলার জারি করা হয়েছে। এ ফান্ডে ব্যাংকের জন্য ছয় শতাংশ স্প্রেড রাখা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যেহেতু ক্লাস্টার ফান্ডের পুরো অর্থই ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে যাবে, তাই আগামী প্রান্তিকগুলোতে উৎপাদন খাতে সিএমএসএমই ঋণের চিত্র আরো ইতিবাচক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, সিএমএসএমই ঋণের বড় অংশ যদি উৎপাদন খাতে না গিয়ে বাণিজ্য খাতে চলে যায়, তাহলে উৎপাদনভিত্তি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়বে না। শুধু ট্রেডিং করে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করা সম্ভব নয়, উৎপাদন ও সেবা খাতও বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান বাড়ে মূলত উৎপাদন, ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে। তাই সিএমএসএমই ঋণ কোন খাতে যাচ্ছে, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরো সতর্ক হওয়া এবং ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। আগে ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পে যে ধরনের ঋণ দেওয়া হতো, সে অর্থ এখন ব্যবসায়ীদের কাছে বেশি যাচ্ছে, এ প্রবণতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো সিএমএসএমই খাত। ব্যাংকঋণ এ খাতের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা, কিন্তু চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এ খাতের ঋণস্থিতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বাড়ছে।
২০২৫ সাল শেষে সিএমএসএমই খাতের ঋণ স্থিতি ছিল তিন লাখ ১৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। কিন্তু গত মার্চ শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৯৮ হাজার ৮৯ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে এ খাতের ঋণ স্থিতি কমেছে ১৬ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সিএমএসএমই খাতে নতুন ঋণ বিতরণ বাড়লেও ঋণের স্থিতি কমেছে। এর মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য নেই। কারণ ঋণস্থিতি হলো ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকা মোট ঋণের পরিমাণ। নির্দিষ্ট ওই প্রান্তিকে নতুন করে যে পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে আদায়ের পরিমাণ বেশি হওয়ায় মোট ঋণ কমেছে।
অধিক কর্মসংস্থানের জন্য জাতীয় এসএমই নীতিতে ২০২৯ সালের মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের অন্তত ২৭ শতাংশ সিএমএসএমইতে বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে বিতরণ করতে হবে ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে তা না বেড়ে কমছে। গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট ঋণের মধ্যে সিএমএসএমইতে দেওয়া হয় ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে যা ছিল ১৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম তিন মাসে ব্যাংকগুলো ৫২ হাজার ১০৮ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এ সময়ে আদায় হয়েছে ৬৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। অবশ্য আদায়যোগ্য ঋণ ছিল এক লাখ ১৭ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। বিতরণের তুলনায় আদায় বেশি হলেও আদায়যোগ্য ঋণের বড় অংশ ফেরত আসেনি। এতে গত মার্চ পর্যন্ত সিএমএসএমই ঋণের ২৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মোটঋণের ২৪ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ছিল খেলাপি। অবশ্য এ খেলাপি ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের তুলনায় কম। গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

