পার্বত্য চট্টগ্রাম : অধিকার ও ভূরাজনৈতিক অস্ত্র

পার্বত্য চট্টগ্রাম : অধিকার ও ভূরাজনৈতিক অস্ত্র

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি আজ দেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটারের এই স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ অঞ্চলজুড়ে আজ যা ঘটছে, তা কেবল কোনো স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা সংকট বা উপজাতীয় অসন্তোষের বিষয় নয়। এটি মূলত ভূরাজনৈতিক চক্রান্ত, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী নীলনকশা এবং আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ঐতিহাসিক ব্যর্থতার এক ভয়াবহ পরিণতি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে রাষ্ট্রের নীতিতে বহু বছর ধরেই একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য দৃশ্যমান। অঞ্চলটি তিনটি আন্তর্জাতিক সীমান্তঘেঁষা এলাকার সমন্বয়ে গঠিত এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতির কৌশলগত সংযোগস্থলে অবস্থিত। অথচ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের কোনো প্রকাশ্য, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল আছে কি না—এই মৌলিক প্রশ্নের আজও স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না। সরকার বদলেছে, মন্ত্রী ও সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারাও বদলেছেন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের পদ্ধতি আজও মূলত ঘটনানির্ভর, প্রতিক্রিয়াশীল ও খণ্ডিত। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের বুকের ওপর কীভাবে বহিরাগত শক্তির ইন্ধনে সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় এবং কীভাবে আমাদের নিজস্ব সীমান্তেই জাতীয় সত্তাকে কোণঠাসা করা হয়েছে, তা আজ আর ঢেকে রাখার সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

দেশের কোথাও বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা হলে নিরাপত্তা অভিযান পরিচালিত হয়। কোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দিলে প্রশাসনিক বৈঠক বসে। আবার আন্তর্জাতিক কোনো ফোরামে অভিযোগ উঠলে প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক, নিরাপত্তাগত ও আন্তর্জাতিক দিকগুলোকে একই কাঠামোর অধীনে এনে সমন্বিত সমাধানের উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ফলে রাষ্ট্র কখনো সমস্যার পেছনে ছুটছে, আবার কখনো পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে; কিন্তু সংকটের মূল গতিপথ নির্ধারণ করতে পারছে না। এই কৌশলহীনতা চলতে থাকলে অপরাপর পক্ষগুলোই বাংলাদেশের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অপচেষ্টা চালাবে।

ইতিহাসকে অস্বীকার করে বর্তমান বোঝা যায় না

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী ১৮৬০ সালে চট্টগ্রামকে বিভক্ত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠন করে। পরবর্তীতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০’-এর মাধ্যমে পাহাড়কে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার যে চক্রান্ত শুরু হয়, পাকিস্তান আমলেও তার কার্যকর নিরসন ঘটেনি। ১৯০০ সালের এই শাসনবিধি বিশেষ প্রশাসনিক ও ভূমি কাঠামো সৃষ্টি করে, যার বহু উপাদান আজও বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

গত শতকের ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং স্বাধীনতার পর জাতিগত পরিচয় ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নসহ বিভিন্ন ইস্যু ঘিরে ক্ষোভ, ভূমি ও প্রতিনিধিত্ব-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং সরকারের প্রতি অবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী ভারত তার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের উপকরণ হিসেবে পাহাড়িদের ব্যবহার করেছে—এমন অভিযোগ বহুদিনের। একটি বিষয় স্পষ্ট, রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকদের ন্যায্য উদ্বেগের রাজনৈতিক সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়, তখন বহিরাগত শক্তির পক্ষে সেই অসন্তোষকে কূটনৈতিক চাপ, সীমান্ত রাজনীতি কিংবা প্রক্সি প্রভাবের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়।

স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক মতবিরোধ দ্রুত সশস্ত্র সংঘাতের রূপ নেয়। ‘শান্তিবাহিনী’র সশস্ত্র বিদ্রোহ, সীমান্তের ওপার থেকে আশ্রয় ও সহায়তা, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং সামরিক অভিযান পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনসংখ্যা কম থাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে রাষ্ট্র যখন নাস্তানাবুদ হচ্ছিল, তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাহাড়ে বাঙালি বসতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে পতিত খাসভূমিতে ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন এবং ভূমিসংস্কারের সূচনা করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় শহীদ জিয়া নিহত হলে এ কার্যক্রম থমকে যায়। পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার এটি অব্যাহত না রাখায় প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গতা পায়নি।

এই ইতিহাসকে কেবল এক পক্ষের নির্যাতনের কাহিনি হিসেবে উপস্থাপন করলে সত্যের একটি অংশই সামনে আসে, অন্য অংশটি আড়ালে থেকে যায়। রাষ্ট্রের উচিত ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধার অস্ত্র না বানিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিক জাতীয় দলিল তৈরি করা। সেই ইতিহাসে কাপ্তাই বাঁধে বাস্তুচ্যুত পাহাড়ি জনগণের দুর্ভোগ যেমন থাকবে, তেমনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নিহত বাঙালি কৃষক, শ্রমিক, সরকারি সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও সদস্যদের আত্মত্যাগের কথাও থাকবে। পাহাড়ি জনগণের সাংস্কৃতিক ও ভূমিসংক্রান্ত উদ্বেগ যেমন স্বীকৃতি পাবে, তেমনি পার্বত্য অঞ্চলের পুরোনো এবং জন্মগ্রহণকারী ও কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী বাঙালি নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারও অস্বীকার করা যাবে না।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি : সমাধানের ভিত্তি, না নতুন বিরোধের উৎস

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (যা কথিত শান্তিচুক্তি নামে পরিচিত) সশস্ত্র সংঘাত বন্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সুযোগ ছিল, এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ের পর অস্ত্রবিরতি, শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন, পার্বত্য মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ, টাস্কফোর্স ও জেলা পরিষদসহ অঞ্চলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক সংলাপের পথ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পাহাড়ের অধিবাসী সব জনগোষ্ঠীকে আলোচনায় না আনা, এক পক্ষকে বঞ্চিত রেখে অপর পক্ষকে একতরফা সুযোগ-সুবিধা প্রদান এবং সংবিধান লঙ্ঘনের নানা অভিযোগের কারণে এটি শেষ পর্যন্ত প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এর প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের কাঠামো। সমালোচকদের একাংশের মতে, চুক্তি সম্পাদনের সময় পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠী, নিরাপত্তাবাহিনী, জনসংখ্যার বিচারে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব না রাখা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে পরবর্তীতে চুক্তির বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে যে, ভূমি, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রথাগত শাসনব্যবস্থা সম্পর্কিত কিছু বিশেষ বিধান পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর মনে বৈষম্য ও প্রান্তিকতার অনুভূতি তৈরি করেছে এবং উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যকার অবিশ্বাসের খাদকে আরো গভীর করেছে। অন্যদিকে কিছু আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের বক্তব্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পৃথক জাতীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের বিতর্কও সামনে এসেছে, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। এ কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে কেবল অতীতের একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে না দেখে, বর্তমান বাস্তবতার আলোকে সব অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এর কার্যকারিতা ও জাতীয় স্বার্থের সামঞ্জস্য পুনর্মূল্যায়ন করা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এর তড়িঘড়ি সম্পাদন প্রক্রিয়া। পার্বত্য সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনা সামরিক শাসনামল এবং ১৯৯১-৯৬ সালের বিএনপি সরকারের সময়েও বিভিন্ন পর্যায়ে চলেছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নেয় এবং এক বছরের মাথায় তা সম্পাদিত হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের দাবি, তৎকালীন আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভারতের কূটনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে চুক্তিটি তাড়াহুড়ো করে সম্পাদিত হয়েছিল। জাতীয় ঐকমত্য ও বিস্তৃত অংশীজনের অংশগ্রহণের অভাব এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতাকে জটিল করে তুলেছে।

চুক্তি প্রণয়ন ও স্বাক্ষরের সময় পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি বাসিন্দা, নিরাপত্তায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং ক্ষুদ্র পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীগুলো পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব পায়নি—এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একইভাবে চুক্তির বিভিন্ন ধারা দেশের একক সাংবিধানিক ব্যবস্থা, নাগরিকদের সমঅধিকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ভূমি কমিশন, স্থানীয় পুলিশ, অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার, স্থায়ী বাসিন্দার সংজ্ঞা এবং আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ এখনো বিদ্যমান।

একই ভূখণ্ডে দুই ধরনের নাগরিকত্ব চলতে পারে না

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা হলো পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারণা প্রতিষ্ঠা করা। এক পক্ষ মনে করে বাঙালির উপস্থিতি পাহাড়িদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস বলে, ১৯৭২ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদের হুমকি এবং ১৯৭৩ সালে সশস্ত্র গেরিলা বিদ্রোহ শুরু হওয়ার বহু পরে ১৯৮৯ সালের দিকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু বাঙালি বসতি গড়ে ওঠে। ফলে বাঙালি পুনর্বাসনের কারণেই সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে—এই অভিযোগ কতটা যুক্তিযুক্ত, তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। অপরদিকে বাঙালিরা মনে করে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সংবিধান-সাংঘর্ষিক ধারা ও বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে তারা নিজ দেশেই বাঙালি পরিচয় হারিয়ে অ-উপজাতি তথা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে।

এই দুই ভয়কে রাজনৈতিক শক্তি ও সশস্ত্র সংগঠনগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে কোনো অঞ্চলে জন্ম, জাতিগত পরিচয় বা বসবাসের ইতিহাসের কারণে ‘বহিরাগত’ হিসেবে অনির্দিষ্টকাল চিহ্নিত করা যায় না। সমগ্র বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমগ্র বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে সবার সমান অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ভূমির সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ককেও অস্বীকার করা যায় না। রাষ্ট্রের কর্তব্য এক পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে অন্য পক্ষের অধিকার সংকুচিত করা নয়; বরং ন্যায়সংগত ও আইনসম্মত ভারসাম্য তৈরি করা।

সশস্ত্র গোষ্ঠী কি বিকল্প সরকার চালাচ্ছে

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে মূলত দুটি ধারা ছিল চুক্তি স্বাক্ষরকারী জেএসএসের জন্য এবং বাকি ৭০টি সরকারের জন্য। কিন্তু জেএসএস তাদের অংশের শর্তানুযায়ী সব অস্ত্র জমা দেয়নি এবং সশস্ত্র ক্যাডারদের পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণ করায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে একাধিক সশস্ত্র সংগঠনের উপস্থিতি প্রকাশ্যে দৃশ্যমান। জেএসএসের বিভিন্ন দল-উপদল, ইউপিডিএফের বিভক্ত গোষ্ঠী, কেএনএফ এবং অন্যান্য স্থানীয় সশস্ত্র নেটওয়ার্কসহ অন্তত সাতটি সংগঠনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ, অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ ও আধিপত্য বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য নৃগোষ্ঠী তথা পাহাড়ি ব্যবসায়ী, শিক্ষক, কৃষক, পরিবহনকর্মী ও ঠিকাদারদের নিয়মিত এসব গোষ্ঠীকে চাঁদা দিতে হয়। একজন নাগরিক সরকারকে কর দেবেন, আবার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকেও তথাকথিত ‘ট্যাক্স’ দেবেন—এ অবস্থা কোনো স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে চলতে পারে না। যেখানে প্রশাসনের অনুমতির পাশাপাশি সশস্ত্র সংগঠনের অনুমতিও নিতে হয়, সেখানে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বাস্তবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। কোনো সশস্ত্র সংগঠনের অপরাধের দায় সমগ্র পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো অনৈতিক এবং কৌশলগতভাবে আত্মঘাতী। অধিকাংশ পাহাড়ি নাগরিকও চাঁদাবাজি, দলীয় সংঘাত ও অস্ত্রের রাজনীতির জিম্মি। তাই নিরাপত্তা অভিযানকে জাতিগত অভিযানে রূপ দেওয়া যাবে না।

‘আদিবাসী’ বয়ান : অধিকারের প্রশ্ন না ভূরাজনৈতিক অস্ত্র

পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিকীকরণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ‘আদিবাসী’ বা ‘ইন্ডিজেনাস’ পরিচয়ের বিতর্ক। জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরাম, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রবাসী নেটওয়ার্কে এই পরিচয়কে ভূমি, স্বায়ত্তশাসন ও প্রথাগত আইনের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকার ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক ও সাংবিধানিক কারণে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘উপজাতি’ বা ‘Ethnic Minority’ পরিভাষা ব্যবহার করে।

এই বিতর্ককে শুধু শব্দচয়নের লড়াই মনে করলে ভুল হবে। পরিচয়ের সঙ্গে যখন ভূমির ওপর সমষ্টিগত কর্তৃত্ব, প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার, পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের দাবি যুক্ত হয়, তখন এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ‘আইএলও কনভেনশন ১৬৯’-এর পক্ষভুক্ত নয়। জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার-বিষয়ক ঘোষণাপত্রও (UNDRIP) একটি ঘোষণামূলক দলিল, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফোরামে এসব নথির রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কোনো বয়ান বারবার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পুনরাবৃত্ত হলে একসময় তা ‘স্বীকৃত সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

বাংলাদেশের মূল দুর্বলতা এখানেই। কতিপয় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বছরব্যাপী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে নিয়মিত বক্তব্য জমা দেয় এবং বিদেশি গবেষকদের সঙ্গে কাজ করে। বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার প্রায়ই শেষ মুহূর্তে গিয়ে প্রতিবাদ জানায়। এভাবে বয়ানের যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায় না। রাষ্ট্রের উচিত নিউ ইয়র্ক, জেনেভা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীতে একটি স্থায়ী তথ্য ও কূটনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা। প্রতিটি অপপ্রচারের বিপরীতে নির্ভরযোগ্য তথ্য, তদন্ত প্রতিবেদন, উন্নয়ন সূচক ও চুক্তির বাস্তব অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরতে হবে। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বস্তুনিষ্ঠ জবাব দিয়েই কেবল আস্থার সংকট দূর করা সম্ভব।

বিদেশি শক্তির ভূমিকা : ধারণা নয়, চলমান বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রের প্রতিফলন

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশী ও বৃহৎ শক্তিগুলোর নজর এখানে থাকা অস্বাভাবিক নয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমারের চিন ও রাখাইন রাজ্য, বঙ্গোপসাগর এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্পগুলো মিলিয়ে অঞ্চলটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতাকে কেবল একটি অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি একটি জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ এবং বহিরাগত শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কারণে অঞ্চলটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নে রাষ্ট্রের নীতি কেবল নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় ঐক্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তথ্যভিত্তিক কূটনীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানের ওপর সমান জোর দেওয়া জরুরি।

বিভিন্ন সময়ে ভারত, পশ্চিমা সংস্থা, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মিয়ানমারের পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে পাহাড়ে প্রক্সি প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় কৌশল গুজবের ওপর দাঁড়াতে পারে না। কোনো বহিরাগত শক্তি যদি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থ, অস্ত্র বা কূটনৈতিক আশ্রয় দেয়, তবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তার শক্তিশালী দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরতে হবে।

এখনই প্রয়োজন একটি জাতীয় কৌশল

পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিষয়ক মন্ত্রণালয় এককভাবে এত জটিল সংকট সামলাতে পারবে—এমন আশা অবাস্তব। বহু সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা পৃথকভাবে কাজ করলেও কেন্দ্রীয় সমন্বয়ের অভাবে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না। তাই সরকারপ্রধানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘জাতীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম কৌশল পরিষদ’ গঠন করা যেতে পারে। তবে এটি যেন আরেকটি অলংকারিক কমিটি না হয়; এর জন্য নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, পেশাদার সচিবালয়, সময়বদ্ধ পরিকল্পনা ও সংসদীয় জবাবদিহি থাকতে হবে। এই পরিষদে পাহাড়ি ও বাঙালি—উভয় জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক ও ন্যায়সংগত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রান্তিক বা জনসংখ্যার বিচারে অতি ক্ষুদ্র জাতিগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি কার্যকর জাতীয় কৌশলের ভিত্তি হতে হবে সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চাঁদাবাজির অর্থনীতি নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগ। একই সঙ্গে ভূমি বিরোধের স্বচ্ছ নিষ্পত্তি, পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর সমনিরাপত্তা এবং বৈষম্যহীন উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা ও রাজনৈতিক সমাধান

পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি আবশ্যক। যতক্ষণ ত্রিদেশীয় সীমান্ত পরিস্থিতি বিদ্যমান, সশস্ত্র সংগঠন, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের লেনদেন থাকবে, ততক্ষণ নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা অস্বীকার করা অবাস্তব। তবে সামরিক উপস্থিতি কোনো রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। সেনাবাহিনী নিরাপত্তামূলক পরিবেশ তৈরি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে; কিন্তু ভূমিবিরোধ, প্রতিনিধিত্ব ও নাগরিক অধিকারের সমাধান রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই করতে হবে। সঠিক নীতি হলো—রাজনৈতিক সংলাপ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপত্তা সক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ।

রাষ্ট্র কি এখনো সময় পাবে

পার্বত্য চট্টগ্রাম আগামীকালই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে—এমন আতঙ্ক ছড়ানো যেমন অনুচিত, তেমনি কোনো কৌশলগত ঝুঁকি নেই বলে আত্মতুষ্টিতে ভোগাও বিপজ্জনক। আন্তর্জাতিক চাপ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা দীর্ঘদিন চললে সংকট হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

দক্ষিণ সুদান বা পূর্ব তিমুরের ইতিহাস বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো—দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, অস্ত্রের রাজনীতি, বিদেশি চক্রান্ত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা একত্র হলে ছোট সংকটও বড় ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।

বাংলাদেশকে দূরদৃষ্টি দিয়ে কাজ করতে হবে। সাধারণ পাহাড়ি নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখা যাবে না, আবার কোনো বাঙালি নাগরিকের অধিকারও বিসর্জন দেওয়া যাবে না। পাহাড়ি, বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ পাহাড়ের সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সমান নাগরিক পরিচয় ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সবার একক পরিচয় হতে পারে পাহাড়ি। এতে ‘আদিবাসী’ বা ‘বহিরাগত’ বিতর্কও দূর হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তহীনতা। কৌশলহীন রাষ্ট্র নিজ ভূখণ্ডেই অন্যের কৌশলের শিকার হয়। সময় এসেছে একটি সর্বদলীয় ও সুদূরপ্রসারী ‘জাতীয় পার্বত্য চট্টগ্রাম কৌশল’ প্রণয়নের, যার মূল ভিত্তি হবে অখণ্ড সার্বভৌমত্ব, নাগরিকদের সমঅধিকার, সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং আইনের শাসন।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন