গাজায় গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর কারণে ইসরাইলের বিরুদ্ধে যখন বিশ্বজনমত গড়ে উঠছে, তখন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার ইউরোপ থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচন প্রভাবিত করে নিজেদের পক্ষের বা ইসরাইল-সমর্থক সরকার ক্ষমতায় আনতে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের কার্যক্রম জোরদার করছে। ইসরাইলের অস্ত্র ও নজরদারি প্রযুক্তি শিল্প নিয়ে আমি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছি। আমি সবসময়ই বুঝেছি, ইসরাইল এ বিষয়ে প্রকাশ্যে যা স্বীকার করে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি তারা জড়িত। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে যে ‘ঘূর্ণায়মান দরজা’ বা পারস্পরিক আদান-প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে, তা সবারই জানা। আর সেই সূত্র কাজে লাগিয়েই ইসরাইলের সমরাস্ত্র নির্মাতা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন দেশে নিজেদের অবস্থান জোরদার করছে। সৌদি আরব থেকে শুরু করে ইথিওপিয়া পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে ইসরাইলের বড় বড় কোম্পানিগুলো এভাবেই অভাবনীয় প্রবেশাধিকার পেয়েছে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘স্পাইওয়্যার কূটনীতি’ হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইহুদি বর্ণবাদী এই দেশটির মিত্র তৈরির অত্যন্ত কার্যকর একটি পন্থা। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে কথিত শত্রু, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এমনকি বন্ধুদের ওপরও নজরদারি চালানোর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করা হয়। তবে এ বিষয়ে আমাদের জানার পরিধিতে সবসময়ই কিছু ঘাটতি ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি তথ্য ফাঁসের ঘটনা পুরো বিষয়টি বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে। ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ‘এনএসও গ্রুপ’ (NSO Group) ফোনের জন্য ‘পেগাসাস’ স্পাইওয়্যার তৈরি করেছে। ২০১৩ সালে এই গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শালেভ হুলিও ইসরাইলি কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিয়ে পানামায় যান এবং সেখানে ইসরাইলি দূতাবাসে অবস্থান করেন।
‘অরগানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট’ এবং আরো দুটি গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১২ সালে পানামার কাছে এনএসও গ্রুপের পেগাসাস বিক্রির ক্ষেত্রে হুলিও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন এবং পানামা সরকারের সঙ্গে চুক্তিতে তিনিই স্বাক্ষর করেছিলেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “সাংবাদিকদের হাতে আসা পানামার অভিবাসন-সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা যায়, হুলিও ২০১৩ সালের ৩ ডিসেম্বর কোপা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পানামা সিটির টোকুমেন বিমানবন্দরে পৌঁছান এবং দেশটিতে প্রবেশের জন্য কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। নথিতে হুলিওর সফরের উদ্দেশ্য হিসেবে ‘বিনোদন’ এবং পেশা হিসেবে ‘কূটনীতিক’ উল্লেখ করা হয়েছে।”
হুলিওর এই তৎপরতা কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নথিপত্রের মাধ্যমেও প্রমাণ করা খুবই কঠিন ছিল। নামে বেসরকারি হলেও এনএসও গ্রুপসহ ইসরাইলের অন্যান্য অনেক অস্ত্র ও নজরদারি কোম্পানি ইসরাইল রাষ্ট্রেরই একটি অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। তারা রাষ্ট্রের স্বার্থ, পক্ষপাত ও এজেন্ডা এগিয়ে নেয় এবং রাষ্ট্রের পূর্ণ সুরক্ষায় কার্যক্রম পরিচালনা করে।
রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা
এনএসও গ্রুপ এবং সমমনা অন্যান্য ইসরাইলি কোম্পানি যে বিপুল পরিমাণ তথ্যভান্ডার গড়ে তুলেছে, তার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ অর্থ প্রদানকারী গ্রাহকদের পরিবর্তে এসব কোম্পানি সরাসরি মোবাইল ফোন থেকে তথ্য বা ডেটা সংগ্রহের কাজটি করে থাকে। তাই এটি অনিবার্য যে, এনএসও গ্রুপ এবং সেই সূত্রে ইসরাইল সরকার এমন সব তথ্য ও গোপন বিষয় সংগ্রহ করেছে, যা বিভিন্ন দেশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি এমন একটি উপায়, যার মাধ্যমে ইসরাইল বিভিন্ন দেশের ওপর অত্যন্ত জোরালো কূটনৈতিক প্রভাব বজায় রাখে।
গত এক দশক ধরে স্পাইওয়্যার ও হ্যাকিং নিয়ে যে লড়াই চলছে এবং তাতে ইসরাইলের এসব কোম্পানি যে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল, সে বিষয়টি এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিভিন্ন দেশের অসতর্ক রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও কর্মীদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি নজরদারি বা স্পাইং টুলগুলোর ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।
স্পাইওয়্যার তৈরি করার শিল্পে যথাযথ নিয়মনীতির অভাবের সুযোগ নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট থেকে শুরু করে রাশিয়াসহ সব দেশেই এটি অবাধে ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিস্তার লাভ করেছে। তবে বিশ্বজুড়ে ইসরাইলের ব্যাপক মাত্রায় নির্বাচনে হস্তক্ষেপের ঘটনার তুলনায় ‘পেগাসাস’-এর মতো সাইবার-সরঞ্জামের হুমকিকে এখন তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে।
স্কটল্যান্ড থেকে ফ্রান্স এবং কলম্বিয়া থেকে হন্ডুরাস—সর্বত্রই ইসরাইলি কোম্পানিগুলো ইসরাইলপন্থি প্রার্থীদের জয়ী করতে নানা গোপন ও অনৈতিক কৌশল (‘ডার্ক আর্টস’) প্রয়োগ করছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল আকারের ‘বট ফার্ম’ ব্যবহার, ফিলিস্তিনপন্থি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রভাবিত বা ম্যানিপুলেট করা। স্পাইওয়্যার শিল্পের ক্ষেত্রে যেমনটা দেখা গিয়েছিল, এক্ষেত্রেও বিশ্ব যেন একধরনের জড়তা ও ভয়ের মধ্যে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
এটি এমন একটি বিষয়, যা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিতে আঘাত করে এবং এর টিকে থাকার সক্ষমতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। নির্বাচনে কারচুপির ইসরাইলি সেবাগুলো সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রি করা হয়। দেশটির এই ভয়ংকর কর্মকাণ্ড অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল ধারণা সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা ও বোঝাপড়াকে বিকৃত করে দিচ্ছে।
অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযান
ল্যাটিন আমেরিকার কথাই ধরা যাক। বর্তমানে এই অঞ্চলটিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য ইসরাইল নানা ধরনের অভিযান চালাচ্ছে। এ বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসন, নেতানিয়াহু সরকার এবং হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের মধ্যে কথিত আঁতাতের খবর সামনে আসে। উল্লেখ্য, হার্নান্দেজকে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার-সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগে সাজা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু রহস্যজনক কারণে পরের বছরই তাকে ক্ষমা করে দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।
এখানে মূল পরিকল্পনাটি হচ্ছে কলম্বিয়া থেকে মেক্সিকো পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের বামপন্থিদের দুর্বল এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ‘অবন্ধুসুলভ’ সরকারগুলোকে অস্থিতিশীল করে সেখানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রপন্থি শক্তিকে ক্ষমতায় বসানো। কলম্বিয়ায় এরই মধ্যে এই অভিযান সফল হয়েছে এবং সেখানে আবেলান্দো দে লা এসপ্রিয়েলা প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী হয়েছেন।
এরপর হয়তো ব্রাজিলের পালা আসছে। কারণ দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ও আগামী অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো নেতানিয়াহুর সমর্থন নিয়ে তার নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। ফলে এটি যৌক্তিকভাবেই ধরে নেওয়া যায় যে, সাধারণ নির্বাচনের আগে বলসোনারোর প্রচারণায় সহায়তা করতে এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার অবস্থান দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে ইসরাইলি নির্বাচনি হ্যাকাররা দিনরাত কাজ করে যাবে।
এ সবকিছু এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ইসরাইল তার ইতিহাসে জনসমর্থনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধসের সম্মুখীন হয়েছে। এটি একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন, যা আগামী বছরগুলোয় পশ্চিমা রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এই পরিস্থিতির মধ্যেও গাজা উপত্যকা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে ইসরাইল।
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সীমাহীন সহিংসতার মাধ্যমে তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি ও ব্যাপকভাবে বাস্তুচ্যুত করার যে ভয়াবহ তৎপরতা চালাচ্ছে ইসরাইল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ইসরাইল রাষ্ট্রটি এখন উগ্র ও বেপরোয়া অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তারা মনে করছে, ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে একটি কট্টর ইহুদি-আধিপত্যবাদী ও ধর্মীয়-গোঁড়া (র্যাবিনিক্যাল) বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এটাই তাদের কাছে উপযুক্ত সময় ও এক বিরল সুযোগ।
গাজা ইস্যুতে বিশ্বজনমত এখন ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে চরম মাত্রায় বিরূপ হয়ে উঠেছে। আর এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে মিত্র খুঁজে পাওয়ার জন্য দেশটির মরিয়া চেষ্টা চালাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আর এই মিত্র খোঁজার অস্ত্র হিসেবে তারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের উগ্রপন্থি রাজনৈতিক দল ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে যাওয়া শাসকদের বেছে নিয়ে তাদের ক্ষমতায় আনার ও টিকিয়ে রাখার মিশনে নেমেছে। এ ব্যাপারে তাদের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে নির্বাচনে কারচুপি করার প্রযুক্তি ব্যবহার।
নির্বাচনি কারচুপির বিষয়টি হয়তো সংকটাপন্ন কোনো রাষ্ট্রের মরিয়া পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি একটি নির্ভরযোগ্য পন্থা, যা স্বৈরাচারী শক্তির মিত্র হিসেবে ইসরাইলের রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে। বর্তমানে ইসরাইল এমন একটি রাষ্ট্র, যা অধিকৃত ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গর্বের সঙ্গে উচ্ছেদ ও গণহত্যার অভিযান চালায় এবং একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে উগ্রপন্থি শক্তির উত্থানে সহায়তা করছে।
মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


