অভ্যুত্থানে কৃতিত্বের কাড়াকাড়ি ও সেনাবাহিনীর ‘নির্ণায়ক ভূমিকা’

অভ্যুত্থানে কৃতিত্বের কাড়াকাড়ি ও সেনাবাহিনীর ‘নির্ণায়ক ভূমিকা’

চব্বিশের ৫ আগস্টে অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থানের এক দিন পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের একটি বিশেষ প্রতিবেদনের চুম্বক অংশ দিয়ে আজকের লেখা শুরু করি। রিপোর্টটি ছিল এমন—‘বাংলাদেশে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা আকস্মিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগের দিন রোববার রাতে সেনাবাহিনী প্রধান তার জেনারেলদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে সিদ্ধান্ত নেন, কারফিউ বলবৎ রাখতে সেনারা বেসামরিক লোকদের ওপর গুলি চালাবে না। বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে জানেন, এমন দুজন সেনা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়েছে, এমন একজন ভারতীয় কর্মকর্তা এমন তথ্য জানিয়েছেন, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পরদিন সোমবার সকালে শেখ হাসিনার সরকারি আবাস গণভবনে যান। প্রধানমন্ত্রীকে তিনি জানান, তিনি দেশজুড়ে যে কারফিউ ডেকেছেন, তা বাস্তবায়নে তার সেনারা অপারগ।’

রয়টার্সের ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়—‘ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যকার অনলাইন বৈঠকের বিশদ বিবরণ এবং শেখ হাসিনার কাছে দেওয়া বার্তা আগে জানাজানি হয়নি। তাদের অনলাইন বৈঠক আর হাসিনাকে দেওয়া বার্তায় ফুটে উঠেছিল—তিনি সেনাবাহিনীর সমর্থন হারিয়েছেন।’

বিজ্ঞাপন

রয়টার্সের উল্লিখিত প্রতিবেদনের মুখ্য বিষয়গুলো ছিল—

১. কারফিউ প্রয়োগে সেনাপ্রধানের অসম্মতি। দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ও ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনা কারফিউ কঠোরভাবে প্রয়োগ ও দমন-পীড়ন চালিয়ে আন্দোলন থামানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তার সেনাবাহিনীর সেনারা সাধারণ জনগণের ওপর গুলি চালাবে না এবং এই নির্দেশ/কারফিউ কার্যকর করতে পারবে না।

২. সেনাবাহিনী প্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠক। ৪ আগস্ট রাতে সেনাবাহিনী প্রধান ও শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সামরিক নেতৃত্ব পর্যালোচনা করে দেখতে পান, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনস্রোত ঠেকানো এবং সরকারের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হয়ে বলপ্রয়োগ না করার ব্যাপারে সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়।

৩. শেখ হাসিনাকে চূড়ান্ত বার্তা দেওয়া। সেনাপ্রধানের কার্যালয় থেকে শেখ হাসিনাকে বার্তা দেওয়া হয় যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং সেনারা কারফিউ বলবৎ করতে পারবে না। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর সমর্থন হারিয়েছেন বুঝতে পেরেই শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ভারতে চলে যান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি না চালানোর সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তই মূলত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও সরকার পতনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল।

প্রসঙ্গটির অবতারণা করা জরুরি মনে করলাম এজন্য যে, গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এসেও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, তৎকালীন ছাত্রনেতৃত্ব ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ‘ক্রেডিট’ বা কৃতিত্ব নেওয়ার একধরনের লড়াই দেখা যাচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের আন্দোলন এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত পটপরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে সশস্ত্র বাহিনী, আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা যে অত্যন্ত কৌশলগত ও নির্ণায়ক ছিল, তা সবাই বেমালুম ভুলে গেছেন। ক্রেডিট রাজনীতির আবহে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা আলোচনা-পর্যালোচনার দাবি রাখে।

শেষ দিনগুলোয় যখন তৎকালীন সরকার আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেয়, তখন সেনাবাহিনীকে কারফিউ কার্যকর করতে বলা হয়। আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেনাবাহিনী নিরীহ নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংসতা চালানো বা গুলি চালাতে স্পষ্ট অনিচ্ছা প্রকাশ করে। ৩ ও ৪ আগস্ট সেনাসদরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকে তরুণ ও মাঠপর্যায়ের অফিসারদের বড় অংশ পরিণাম-পরিণতির তোয়াক্কা না করেই আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানান। এটি ছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতন সুনিশ্চিত করার সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ ধাক্কা।

কেউ স্বীকার করুক বা না করুক ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্টের পরিবর্তে এক দিন এগিয়ে আনার ক্ষেত্রেও ক্যান্টনমেন্ট থেকে ইশারা ছিল। ৫ আগস্টের ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচিতে যখন লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে আসে, তখন সেনাবাহিনীর নমনীয়, দেশ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাকে প্রাধান্য দেওয়া এবং পেশাদার অবস্থান পরিস্থিতির মোড় সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ঢাকার প্রবেশমুখগুলোয় সেনাবাহিনী বুলেট দিয়ে সাধারণ মানুষকে আটকানোর পরিবর্তে ব্যারিকেড শিথিল করে দেয়। ফলে গণভবনের দিকে জনতার ঢল বাধাগ্রস্ত হয়নি, যা সরকার পতনের ঘটনাকে ত্বরান্বিত করে। উত্তরা বিএনএস সেন্টারের সামনে সেনাবাহিনীর সদস্যদের ফাঁকা গুলি করে জনতাকে আটকানোর যে চেষ্টা দেখা গেছে, তা ছিল শেখ হাসিনাকে গণভবন থেকে বেরিয়ে যেতে সময় দেওয়ার জন্য। সেনাবাহিনী চায়নি গণরোষে পড়ে শেখ হাসিনার জীবন বিপন্ন হোক। ১৫ আগস্টের মতো আরেকটি ট্র্যাজেডির দায় নেওয়া সেনাবাহিনী সমীচীন মনে করেনি। তেমনটা হলে গণঅভ্যুত্থানের ফলাফল ভিন্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

আবার সেনাবাহিনী যদি সরকারের নির্দেশে পূর্ণ শক্তিতে আন্দোলন দমন করতে নামত, তবে দেশে মারাত্মক গৃহযুদ্ধ বা ব্যাপক প্রাণহানির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত। কৌশলগত নীরবতা এবং সরকারের বাধ্যবাধকতা মেনে না নেওয়ার সিদ্ধান্তই আন্দোলনকে সফলতার চূড়ায় নিয়ে যায়। অভ্যুত্থানের শেষ ৪৮ ঘণ্টায় পুলিশ প্রশাসন আক্রমণাত্মক থাকলেও সেনাবাহিনী মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে এবং চূড়ান্তভাবে শেখ হাসিনার হুকুম তামিল বা আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দিল্লিতে চলে যাওয়ার পর দেশে যেন কোনো শূন্যতা বা অরাজকতা তৈরি না হয়, সে ক্ষেত্রে সেনাপ্রধান ও সেনাসদর দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। অনেকের স্মরণ থাকার কথা, শেখ হাসিনার গণভবন ত্যাগের খবর আসার পরপরই রাস্তায় নেমে আসা ছাত্র-জনতার বড় অংশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও জোয়ানদের সঙ্গে কোলাকুলি করার পাশাপাশি স্লোগান দেয়—‘এই মুহূর্তে দরকার, সেনাবাহিনীর সরকার।’ সেনাপ্রধান বা সশস্ত্র বাহিনী এ স্লোগানে প্রলুব্ধ বা কর্ণপাত না করে বেসামরিক সরকারের দিকেই মনোযোগ দিয়েছে। সেনাবাহিনীতে থাকা শেখ হাসিনার অনুগত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও চেয়েছিলেন সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করুক। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথের আগ পর্যন্ত সেনানিবাসে ক্ষমতা দখল এবং ক্যু-পাল্টা ক্যুর চেষ্টা হলেও বাহিনীর দেশপ্রেমিক ও গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ অংশ তা হতে দেয়নি।

যারা সেনাবাহিনীর কৃতিত্ব মুছে ফেলতে চান, তারাও স্বীকার করবেন, সেনাপ্রধান বক্তব্য দেবেন—এই ঘোষণা টিভি স্ক্রলে ভেসে ওঠার পরই কিন্তু রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা আশ্বস্ত হন এবং শেখ হাসিনার পতনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে বিজয়োল্লাসে ব্যাপকভাবে মাঠে নামেন। ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক দলের যেসব নেতাকর্মী ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি সফল করতে রাজধানীর চারপাশে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের কাছেও আগের দিনই সেনানিবাস থেকে সবুজ সংকেত গিয়েছিল বলেই প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছিলেন। ৫ আগস্ট বিকালে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সরাসরি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনকারী সমন্বয়কদের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পথ সুগম করেন।

অস্বীকার করার উপায় নেই, আন্দোলন গড়ে তোলা এবং রাজপথে রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনার মসনদ নড়বড়ে করার মূল কৃতিত্ব ছাত্র-জনতার; বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সম্মুখভাগের নেতা নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহদের। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতারা পেছন থেকে সাহস জুগিয়েছেন। বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এমন মোক্ষম একটি সময়ের জন্য মুখিয়ে ছিলেন এবং তা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন; পর্দার আড়ালে থেকে ছাত্রনেতৃত্বকে উৎসাহ দিয়ে আন্দোলন এগিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতার চূড়ান্ত ভারসাম্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইন অমান্য এবং জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল টেকনিক্যাল পয়েন্ট অব ভিউ থেকে সবচেয়ে নিয়ামক বা নির্ণায়ক। এটি ছাড়া অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পরিণতি এত দ্রুত এবং কম প্রাণহানিতে অর্জন করা হয়তো সম্ভব হতো না।

দীর্ঘ ১৭ বছরের নিপীড়নের শাসন থেকে বহুল কাঙ্ক্ষিত মুক্তি ও নিকৃষ্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার করুণ বিদায় নিশ্চিত করার কৃতিত্ব কোনো এক দল বা গোষ্ঠীর নয়। গুটিকয় আওয়ামী লুটেরা ও দুর্বৃত্ত ছাড়া সবারই কমবেশি অবদান রয়েছে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের ক্ষেত্রে। রাজনৈতিক দলগুলোর অবদান আমি মহান মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক শক্তি হিসেবে ভারতের ভূমিকার সঙ্গে তুলনা করতে চাই। অনেকের এটা পছন্দ নাও হতে পারে। ভারত যেমন পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বশক্তি নিয়ে নেমেছিল, আমাদের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও দীর্ঘ ১৭ বছরের ব্যর্থতা গুছিয়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ছাত্রদের কোটার আন্দোলনে সর্বশক্তি নিয়ে সহায়ক শক্তি ছিল। তার সঙ্গে সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমিক অংশের ভূমিকা বিশেষ মাত্রা যোগ করে। ফলে ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধ ও অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। অবসান ঘটে দীর্ঘ দেড় দশকের একচ্ছত্র ও স্বৈরাচারী শাসনের।

দুবছর ধরে বিজয়ের কৃতিত্ব কার, কার ত্যাগ সবচেয়ে বেশি, আর কোন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা কী ছিল—তা নিয়ে চলছে হিসাব-নিকাশ ও তুমুল কাড়াকাড়ি। কিন্তু আড়ালে পড়ে যাচ্ছে সেই চরম সংকটের মুহূর্তগুলোর কথা, যখন দেশের রাজপথ পরিণত হয়েছিল বারুদ আর রক্তে। চূড়ান্ত সেই সংকটকালে সশস্ত্র বাহিনীর, বিশেষত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সময়োপযোগী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা যদি না থাকত, তবে এই অভ্যুত্থানের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারত, তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়।

কোনো আন্দোলন বা অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ত্যাগ ও রাজপথের রক্তদান সবসময়ই মূল শক্তি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনও এর ব্যতিক্রম নয়। হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ, রক্ত আর অসীম সাহসই ছিল এই অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু ইতিহাসে দেখা গেছে, চূড়ান্ত মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর অবস্থান কী—তার ওপরই নির্ভর করে কোনো গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য কিংবা পরাজয়। ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার পতন কেবল রাজপথের উত্তাপ দিয়ে নির্ধারিত হয়ে যায়নি; তা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।

যে যার মতো বিশ্লেষণের অধিকার রাখেন। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, কারফিউ জারির পর শেখ হাসিনা টিকে গেছেন বলে ধারণা করতে শুরু করেছিলেন অনেক পোড় খাওয়া রাজনীতিকও। অনেক শীর্ষ রাজনীতিককে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুনতে পেয়েছি—‘আহ! এবারও টিকে গেল।’ কিন্তু ৩০ জুলাইর পর নতুন ছাত্রদের মুক্তির দাবি তুলে বিভিন্ন পেশার মানুষের রাস্তায় নামার পেছনেও সেনানিবাসের তরুণ কর্মকর্তাদের নেপথ্য ভূমিকার কথা আমার তখনই জানা ছিল। শেখ হাসিনা যখন মেট্রোরেল, বিটিভি ও সেতু ভবনের গাড়ির কঙ্কাল নিয়ে কান্নাকাটি করে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টায় কিছুটা সফল হন, তখনই পারিপার্শ্বিক অবস্থার মোড় ঘোরে ৩ আগস্ট। সেদিন রাতে সেনাসদরে অনুষ্ঠিত হয় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অফিসার্স মেস মিটিং। এতে সেনাবাহিনীর জুনিয়র ও মিড-লেভেলের অফিসারদের প্রতিনিধিরা সেনাপ্রধানের মুখোমুখি হন। বৈঠকে উপস্থিত তরুণ সেনা কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার অগণতান্ত্রিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে সরাসরি অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন। তারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, সেনাবাহিনী কোনোভাবেই নিজ দেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলি চালাবে না এবং জনগণের মুখোমুখি দাঁড়াবে না।

জেনারেল ও অফিসারদের সেই আবেগঘন ও নীতিগত অবস্থান সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের ওপর এক মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক চাপ তৈরি করে। সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ানদের সাধারণ মানুষের প্রতি এই সহানুভূতি ও সংহতি ছিল এক স্পষ্ট বার্তা—সেনাবাহিনী আর কোনো স্বৈরাচারী শাসককে রক্ষা করার জন্য অস্ত্র তুলবে না। ৩ আগস্টের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকই মূলত শেখ হাসিনা সরকারের পতনকে সময়ের ব্যাপারে পরিণত করেছিল।

সেনানিবাসের ওই বার্তা ছড়িয়ে পড়লে পরদিন ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ কর্মসূচিতে নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ। শাসকদলের ক্যাডার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের হামলায় সারা দেশে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। সারা দেশে যখন রক্তগঙ্গা বইছিল, তখন রাজপথে দায়িত্বপালনরত সাধারণ সেনাসদস্যদের আচরণে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা যায়। সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান ও পেট্রোল টিমগুলো রাজপথে থাকলেও তারা ছাত্র-জনতার দিকে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেনি। অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষ সেনাসদস্যদের বুকে জড়িয়ে ধরেছে, তাদের সাঁজোয়া যানের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা উড়িয়েছে। সেনাজওয়ানদের মধ্যে ছিল না কোনো দমন বা প্রতিরোধমূলক তৎপরতা; বরং তারা বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। শাসকগোষ্ঠী যখন চেয়েছিল রাজপথ রক্তে ভাসিয়ে দিয়ে সেনাশাসন বা কঠোর দমনপীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখতে, তখন সেনাবাহিনী জনগণকে রক্ষা করার নীতি গ্রহণ করে। সেনাবাহিনীর এই নীরব সংহতি আন্দোলনকারী সাধারণ মানুষকে ১০ গুণ সাহস জুগিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক এই বাহিনী এখন জনগণের পাশে।

দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনে জেনারেল আজিজ, মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকী, মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং ডিজিএফআই ও র‍্যাবে কর্মরত দলবাজ কর্মকর্তারা সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিকে তলানিতে নামিয়েছিলেন। অনেক বিশ্লেষক হতাশা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, দিল্লির দাসত্ব ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র’-এর মর্জিমাফিক কাজ করা এই সেনাবাহিনীকে দিয়ে আর কিছু হবে না। শেখ হাসিনা পরিকল্পনাগতভাবে সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ক্ষমতার সেবাদাসত্ব ও লুটপাটের অংশীদারত্বে অভ্যস্ত করে তুলেছিলেন। সেই সেনাবাহিনীরই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ অংশ অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়ে জনআকাঙ্ক্ষার পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ অথচ সাহসী ভূমিকা নিয়ে জনমনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ অনেকখানি প্রশমিতই শুধু করেনি, ব্যাপকভাবে নন্দিতও হয়েছে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী চরম বিশৃঙ্খল ও টালমাটাল পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী মাঠে থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। এ ক্ষেত্রে বিচ্যুতি হলে অন্তর্বর্তী শাসনে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারত। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় হয়েও সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে খোদাই করে লেখার মতো। যদিও সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ছয় শতাধিক খুনি ও লুটেরাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে বাহিনীর একটি অংশ অবশ্যই নিন্দিত এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আসা উচিত বলে মনে করি।

রাজনৈতিক ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ আর কৃতিত্বের কাড়াকাড়িতে যাতে এই সত্য হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা সচেতন নাগরিক সমাজের দায়িত্ব। সশস্ত্র বাহিনীর সে সময়ের ঐতিহাসিক অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে আন্দোলনকারীদের ত্যাগকে ছোট করা নয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবদানকেও খাটো করা নয়; বরং বিজয়ের পেছনের প্রতিটি ভিত্তিকে সম্মান জানানো।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন