বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা তুলে নেওয়ার হার বেড়েছে দ্বিগুণ

বিদেশি ব্যাংকের মুনাফা তুলে নেওয়ার হার বেড়েছে দ্বিগুণ

দেশে পুনঃবিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে বিদেশে মুনাফা ও আয় পাঠানো বাড়িয়েছে বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলো। ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) এসব ব্যাংকের বিদেশে মুনাফা পাঠানো আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। একই সময় দেশে পুনঃবিনিয়োগ অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলো মুনাফা ও আয় বাবদ বিদেশে পাঠিয়েছিল ৫৭৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৩১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে মুনাফা ও আয় পাঠানো বেড়েছে প্রায় ১২৮ শতাংশ। একই সময় লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) বাবদ আরো ৫৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকা বিদেশে পাঠানো হয়েছে। আগের বছরের একই সময় এ খাতে পাঠানো হয়েছিল ৪৭৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে কোনো লভ্যাংশ পাঠানো হয়নি।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে একই সময় পুনঃবিনিয়োগকৃত আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালের দ্বিতীয়ার্ধে যেখানে পুনঃবিনিয়োগের পরিমাণ ছিল চার হাজার ৫৯৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা; ২০২৫ সালের একই সময় তা কমে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৬ কোটি ৪০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ, এক বছরে পুনঃবিনিয়োগ অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।

ব্যাংক খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি ব্যাংকগুলো সাধারণত মুনাফার একটি অংশ বাংলাদেশে পুনঃবিনিয়োগ করে এবং বাকি অংশ মূল প্রতিষ্ঠানে পাঠায়। ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে পুনঃবিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি লভ্যাংশ পরিশোধও পুনরায় শুরু হওয়ায় বিদেশে মুনাফা প্রেরণ বেড়েছে। এছাড়া দেশে নতুন ঋণ বিতরণ ও শাখা সম্প্রসারণে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কম থাকায় মুনাফার বড় অংশ মূল প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল তিন হাজার ৫৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময় তা বেড়ে হয়েছে তিন হাজার ৭৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ ব্যয় তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম। তাদের হাতে বর্তমানে বিনিয়োগযোগ্য পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। এ অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মতো নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করেও তারা ভালো মুনাফা করতে পারে।

কিন্তু দেশি ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি ভিন্ন। তারল্য সংকটের কারণে তাদের উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হচ্ছে। আবার সুশাসনের ঘাটতি ও আস্থাহীনতার কারণে প্রথম প্রজন্মের অনেক ব্যাংকের অবস্থাও নাজুক। ফলে উচ্চ সুদের প্রস্তাব দিয়েও তারা পর্যাপ্ত আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না।

তিনি বলেন, দেশের বেশিরভাগ ব্যাংকের মূলধন কাঠামো এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছায়নি। আবার খেলাপি ঋণের উচ্চহারের কারণে অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এ কারণে বড় অঙ্কের অর্থায়ন বা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে। এ সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে বিদেশি ব্যাংকগুলো। তারা তুলনামূলক কম কমিশনে এলসি খুলতে পারছে। অন্যদিকে অনেক দেশি ব্যাংকের ক্ষেত্রে এলসি খুলতে তৃতীয় পক্ষের কনফারমেশন প্রয়োজন হচ্ছে।

বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়নেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বরে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে, যা জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময় ৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ হয়েছে, যা মোট আমদানি বিলের ১৩ দশমিক ১ শতাংশ। তবে রেমিট্যান্স আহরণে তাদের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ।

বর্তমানে দেশে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৭০টি শাখা ও পাঁচটি উপশাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্বাধীনতার পর থেকেই এসব ব্যাংক মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

ব্যাংকগুলো হলো—স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, উরি ব্যাংক, সিটিব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, ব্যাংক আল-ফালাহ লিমিটেড, হাবিব ব্যাংক লিমিটেড এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত। তবে একই সময় দেশের মোট ব্যাংক খাতে তাদের আমানতের অংশ ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। আমানতের বড় অংশ চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব এবং আবাসিক বৈদেশিক মুদ্রা (আরএফসিডি) হিসাবে থাকায় তুলনামূলক কম খরচে তহবিল সংগ্রহের সুবিধা পাচ্ছে এসব ব্যাংক।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ঋণ বিতরণে। এক বছরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিম ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৬ হাজার ১২৩ কোটি টাকায় নেমেছে, যা প্রায় ১১ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস। একই সময় মোট ব্যাংক খাতের ঋণে তাদের অংশও ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন