দেশে বিদ্যুৎ সংকট এবং তেলের দাম বেশি হওয়াতে মৌলভীবাজারের চা-শিল্পেও নেমেছে ধস। স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় কমছে উৎপাদন। নষ্ট হচ্ছে গুণগত মান । বাড়ছে উৎপাদন খরচ ।
জানা গেছে, দিনে এবং রাতে আট থেকে ১০ ঘণ্টর লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে মৌলভীবাজারের চা-শিল্প। দীর্ঘ বিদ্যুতের লোডশেডিং থাকায় এ ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। চা বাগানের জন্য কিছু এলাকায় আলাদা ফিডার থাকলেও মিলছে না এর সুফল। প্রতিদিনই প্রতিটি চা বাগানে নষ্ট হচ্ছে কয়েক লাখ টাকার চা পাতা। বাড়ছে চা উৎপাদনের খরচ । অথচ মিলছে না প্রকৃত দাম। চা উৎপাদনে গুণগত মান ধরে রাখতে না পারলে মিলবে না দামও। দ্রুত এ সব সমস্যা উত্তরণ করা না গেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন চা বাগান মালিকরা। বন্ধ হবে চা বাগান, সরকার হারাবে রাজস্ব, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে দেখা গেছে, সারা দেশের ১৭৩টি চা বাগানসহ মৌলভীবাজারের ৯৩টি চা বাগানের রয়েছে সবুজ সোনা চা পাতা। এ সবুজ চা পাতা থেকে তৈরি কালো বা গ্রিন পাতা দিয়েই দেশের নাম ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু সেই সোনালি স্বপ্ন আজ ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে। এবার ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে পড়েছে চা-শিল্প। লোডশেডিংয়ে নষ্ট হচ্ছে এ সোনা। এর সঙ্গে মিশে আছে শ্রমিক-মালিকদের স্বপ্ন ও রুটি-রুজি। ঘনঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত চা-শিল্প। মিলছে না সঠিক দাম, বাড়ছে উৎপাদন খরচ, ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন আর গুণগত মান। নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের লোডশেডিং নিরসনে নেই কোনো উদ্যোগ। চা পাতা সংগ্রহের ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টার মধ্যে উৎপাদন শুরু করার কথা থাকলেও সেখানে ৭০ থেকে ৮০ ঘণ্টা লাগছে। জেনারেটর চালালেও পুরো ফ্যাক্টরি চালানো সম্ভব হয় না। আর তেল খরচ বেশি হওয়াতে বাড়ছে উৎপাদন খরচও। কিন্তু নিলামে মিলছে না প্রকৃত দাম। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চা-শিল্প। ঘনঘন লোডশেডিংয়ে নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রাংশও। এ বিষয়ে ফ্যাক্টরি ম্যানেজার বাবু জামাল উদ্দিন, মিস্ত্রি রুস্তুম হোসেন, ইলেকট্রিশিয়ান ধীরেন সিংহ, পাতা সর্দার মিলন ও রোদন ভৌমিক বলেন ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকায় পাতা শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ডায়ারমেশিন বন্ধ থাকায় নষ্ট হচ্ছে প্রচুর পাতা। এতে করে পাতা চয়নকারীরাও হচ্ছেন নিরুৎসাহিত। নষ্ট হচ্ছে দামি দামি মেশিন, চায়ের গুণগত মান ধরে রাখা যাচ্ছে না।
পাত্রখলা চা বাগানের ফ্যাক্টরি ম্যানেজার নুর মোহাম্মদ ফারুকী সিয়াম জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে নষ্ট হচ্ছে চা পাতার গুণগত মান, অনেক মেশিনারিজ নষ্টের পাশাপাশি উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
এতে করে চা বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি স্বপন কুর্মি, সর্দার সুপার ভাইজার হারুন উর রশিদসহ নেতারা ও বাগানের শ্রমিক সর্দাররাও হতাশ। তারা সঠিক সময়ে মজুরি পাওয়া নিয়েও আছেন শঙ্কায়। চা বাগানগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ জড়িত। বিদ্যুৎ না থাকাতে শ্রমিকরা অতিরিক্ত রোজগার থেকেও বঞ্চিত। বাড়ছে হতাশা। তারা বলেন, চা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণে মহিলারা পাতা তুলতে যেতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাছাড়া নিলামে ভালো দামে পাতা বিক্রি না হলে শ্রমিকদের মজুরি, বোনাস ও রেশন আটকে যাবে। এতে করে তারা সমস্যায় পড়বেন।
এ চা বাগান ম্যানেজার ইউসুফ খানসহ চা বাগান সংশ্লিষ্টরা বলছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুয়ায়ী রপ্তানিমুখী ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। বাগান কর্তৃপক্ষ বারবার বিদ্যুৎ বিভাগে চিঠি দিয়ে আলোচনা করলেও মিলছে না কোনো সুফল। চা পাতা বিক্রিতেও মিলছে না ন্যায্য দাম।
ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) জেনারেল ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে চা উৎপাদন ব্যাহত, গুণগত মান নষ্ট, লাখ লাখ টাকার মেশিনারিজ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জেনারেটর চালালে সব ইউনিট চালানো যায় না। আর এ কারণে চা উৎপাদনের খরচ অনেক গুণ বেড়ে যাওয়ার কথাও বলেন এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আবাসিক গ্রাহকের তুলনায় তিন থেকে চারগুণ বিদ্যুতের দাম বেশি দিলেও তারা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পান না। এছাড়াও চা বাগানের জন্য আলাদা ফিডার করে দেওয়ার কথা থাকলেও বিদ্যুৎ বিভাগ তা করে দিচ্ছে না। এতে করে বাগানগুলো সমস্যায় পড়ছে।
শ্রীমঙ্গল টি ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এসএমএন মুনির (সৈয়দ মুনির) জানান, সরকার সর্বনিম্ন চায়ের দাম নিলামে সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য ২৪৫ টাকা কেজি নির্ধারণ করে দিলেও বিভিন্ন কারণে সে মানের চা উৎপাদন করতে পারছে। এতে করে চায়ের প্রকৃত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না ও অনেক চা অবিক্রীত থাকছে। তিনি বলেন, এতে করে বাগানগুলো সমস্যায় পড়ছে, অনেক বাগান নিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি দিতে পারবে না।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কমলগঞ্জ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার ঘোষ জানান, চাহিদার তুলানায় জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ না পাওয়াতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। প্রতিদিনই ২৫ থেকে ৩০ ভাগ লোডশেডিং করে চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। এতে করে চা বাগানগুলোতে সমস্যা হচ্ছে। তিনি বলেন, ডানকান ব্রাদার্সের কয়েকটি বাগানের জন্য আলাদা ফিডার থাকলেও অন্য বাগানের জন্য তা করা সম্ভব হয়নি। বরাদ্দ পেলে আলাদা ফিডার নির্মাণ করার প্রতিশ্রুতিও দিলেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এ কর্মকর্তা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

