হাওরাঞ্চলে ২৩০ বিদ্যালয়ের ১৪৯টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক

হাওরাঞ্চলে ২৩০ বিদ্যালয়ের ১৪৯টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক
ছবি: আমার দেশ

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক সংকটে নাকাল প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন—এই তিন উপজেলার ৬৫ শতাংশ স্কুলে প্রধান শিক্ষক ও প্রায় ২২ শতাংশ সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য। পাশাপাশি রয়েছে আবাসন সমস্যা। ওয়াশব্লক সংকটে ঝুঁকিতে পড়েছে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা। দ্রুত শূন্যপদ পূরণসহ সব সমস্যা সমাধানের দাবি জানিয়েছেন হাওর এলাকার বাসিন্দারা।

​জেলার দুর্গম হাওর জনপদ অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার ২৪টি ইউনিয়নে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বসবাস। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য রয়েছে মাত্র ২৩০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (স.প্র.বি) ও প্রায় ৩০টি কিন্ডারগার্টেন।

বিজ্ঞাপন

​এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান, আর অধিকাংশ প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। এ ছাড়া শ্রেণিকক্ষ সংকটে শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসানো হয়, স্কুল পরিচালনা করতে হয় দুই শিফটে। তিন উপজেলায় এবার প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ৪৬ হাজার ৪২৯ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।

​বেশিরভাগ স্কুলে নেই খেলার মাঠ ও শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা। বিদ্যালয়ে ওয়াশব্লক ও সুপেয় পানির সংকটে শিশু শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

​সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত আছেন ৮১ জন এবং দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে ১৪৯টি পদ। ১ হাজার ১৫১টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১ হাজার ৪৪ জন, শূন্য পদ রয়েছে ১০৭টি।

​প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদে 'চলতি দায়িত্ব' ও 'অতিরিক্ত দায়িত্ব' পালন করছেন ১৪৯ জন সহকারী শিক্ষক। ফলে সহকারী শিক্ষকের প্রকৃতপক্ষে ২৫৬টি পদ শূন্য। এসব শূন্য পদের কারণে বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান অভিভাবক ও শিক্ষকরা।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, অষ্টগ্রামের ৮টি ইউনিয়নে ৮৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৭ হাজার ৩০০। ৮৩ জন প্রধান শিক্ষকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন ২৫ জন, শূন্যপদ ৫৩টি। ৪১০টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ১৯টি পদ শূন্য রয়েছে। তবে প্রধান শিক্ষক পদে ৫৩ জন অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব পালন করায় বাস্তবে ৭২টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য।

​ইটনার ৯টি ইউনিয়নে ৭২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৪ হাজার ৬২৯ জন। ৭২ জন প্রধান শিক্ষকের বিপরীতে ৪৬টি পদ শূন্য, কর্মরত ২৬ জন। ৩৭২টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ২৮টি পদ শূন্য (দুটি সহকারী শিক্ষক পদে মামলা চলমান)। তবে প্রধান শিক্ষক পদে ৪৬ জন অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব পালন করায় বাস্তবে ৭৪টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য।

​মিঠামইনে ৭টি ইউনিয়নে ৭৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১৪ হাজার ৫০০ জন। ৭৫ জন প্রধান শিক্ষকের বিপরীতে ৫০টি পদ শূন্য, কর্মরত ২৫ জন। ৩৫০টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে ৬০টি পদ শূন্য। তবে প্রধান শিক্ষক পদে ৫০ জন অতিরিক্ত ও চলতি দায়িত্ব পালন করায় বাস্তবে ১১০টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য।

​চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাজিদুর রহমানের অভিভাবক মাসুম মিয়া বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের মেধা বিকাশে শিক্ষকসংকট অন্যতম প্রধান বাধা। শূন্যপদে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে এবং কর্মরত শিক্ষকদের আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। নতুবা শিশুশিক্ষার ভিত্তি নড়বড়ে বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

​মিঠামইন উপজেলার হাসিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমার স্কুলে ২৩৪ জন শিক্ষার্থী। চারজন শিক্ষকের স্থলে আছি মাত্র একজন। সম্প্রতি দুজন স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নিচ্ছি। এখন আমাকে উপজেলায় মাসিক সভায় থাকতে হচ্ছে। সহকারী শিক্ষক পদায়ন না হলে এই সংকটের সমাধান হবে না।’

​ইটনার ধনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুপ্রজিৎ দাস চৌধুরী বলেন, ‘আমার স্কুলে ২২০ জন ছাত্রছাত্রী। ৬ জন শিক্ষকের স্থলে কর্মরত আছি ৪ জন। মাঝেমধ্যেই আমাকে উপজেলা অফিসে যেতে হয়। সে সময় তিন শিক্ষকের পক্ষে নিয়মিত পাঠদান করানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তারপরও পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগ দরকার।’

​এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান বলেন, ‘সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতিবিষয়ক মামলার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে বহু বছর ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। জুলাই মাসে সেই মামলার রায় হয়েছে। অচিরেই শূন্যপদ পূরণ হবে বলে আশা করছি।’

​শিক্ষকসংকটে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্বীকার করেন কিশোরগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুনর রশিদ। তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে ক্লিয়ারেন্স এলে অধিদপ্তর থেকে পদায়ন শুরু হবে। নিয়োগ ও বদলি সমন্বয়ের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষকের শূন্যপদ অনেকাংশেই কমে আসবে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন