প্রত্যক্ষদর্শী লে. ক. রফিকুলের জবানবন্দি

নির্জন স্থানে নিয়ে হাত-পা বাঁধা বন্দিদের গুলি করে হত্যা করেন জিয়াউল

নির্জন স্থানে নিয়ে হাত-পা বাঁধা বন্দিদের গুলি করে হত্যা করেন জিয়াউল

গভীর রাতে গাজীপুরের গহীন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় হাত-পা বাঁধা কয়েকজন বন্দিকে। র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধান জিয়াউল আহসান সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে এসব বন্দিকে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যান। এরপর ধাপে ধাপে গাড়ি থামিয়ে ঠান্ডা মাথায় বন্দিদের গুলি করে হত্যা করে ফেলে দেন জিয়াউল। পরে জানা যায়, গাজীপুরের জয়দেবপুরে কয়েকটি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করা হয়।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) রফিকুল ইসলামের জবানবন্দিতে এসব কথা উঠে আসে।

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের দুঃশাসনের সময় শতাধিক মানুষকে গুম, নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দিতে রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি ১৯৯২ সালে সেনাবাহিনীতে ২৬তম লং কোর্সে কমিশনপ্রাপ্ত হই। ২০২২ সালে স্বাভাবিক নিয়মে লে. কর্নেল পদে থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করি। আমি ২০০৯ সালে উপ-অধিনায়ক হিসেবে র‌্যাব-১ এ যোগদান করি। র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক থাকাকালে ২০১১ সালের ১১ জুলাই অফিসে আসার পরে তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান স্যার আমাকে ফোন করে বলেন, আজকে রাতে একটা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে যেতে হবে। তুমি তোমার অফিসারদের নিয়ে প্রস্তুত থেকো। ওইদিন রাত ১১টার পর মেজর সাজ্জাদুল, মেজর তরিকুল এবং মেজর এমারতসহ আমরা র‌্যাব সদরদপ্তরে জিয়াউল আহসানের জন্য অপেক্ষা করি। এরপর স্যার এলে আমার গাড়িতে র‌্যাব-৩-এর তিনজন অফিসার এবং অন্যান্য তিনটি গাড়ির একটিতে জিয়াউল আহসান স্যারসহ মোট চারটি গাড়ি একত্রে রওনা হয়। টঙ্গী আহসান উল্যাহ মাস্টার ফ্লাইওভার থেকে নেমে একটু ডান দিকে মোড় নিয়ে একটা রাস্তায় উঠে সামনে অগ্রসর হতে থাকি। আনুমানিক ৪০ মিনিট যাওয়ার পর একটা ব্রিজের ওপর গাড়ি থামে। সবাই নামলে জিয়া স্যার আমাদেরকে বলেন, এখানে এখন একটা সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে। এরপরই গাড়ি থেকে হাত-পা বাঁধা একজনকে নামিয়ে মাথায় গুলি করে পানিতে ফেলে দেন জিয়াউল স্যার।

জবানবন্দিতে রফিকুল বলেন, এরপর জিয়া স্যারের নির্দেশে পুনরায় গাড়ি চলতে থাকে। আনুমানিক ৪-৫ মিনিট যাওয়ার পরে পুনরায় আরেকটি ব্রিজের ওপর গাড়িগুলো থামাতে বলেন। এরপর ২-১ মিনিটের মধ্যেই আগের মতো হাত এবং চোখ বাঁধা অবস্থায় একজন ব্যক্তিকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ব্রিজের রেলিংয়ের কাছে আনা হয়। তখন জিয়াউল আহসান স্যার মেজর সাজ্জাদুলকে বলেন, এখন আরও একটা সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে, সেটা তুমি করবে। মেজর সাজ্জাদুল তখন জানতে চান, কে সন্ত্রাসী, কেন এই অপারেশন করব? জিয়াউল আহসান স্যার বলেন, আমার নির্দেশ মোতাবেক কাজ করো। সাজ্জাদুল তখন অপারেশন করতে অপারগ বলে জানান। জিয়া স্যার ক্ষিপ্ত হয়ে সাজ্জাদুলকে কাওয়ার্ড, স্টুপিড বলে গালমন্দ করে এবং গাড়িতে গিয়ে বসতে বলেন। আমিও গাড়িতে গিয়ে বসি। কিছুক্ষণ পরে বাকিরা যার যার গাড়িতে উঠে যায়। স্যারের নির্দেশক্রমে পুনরায় গাড়িগুলো সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আনুমানিক ৮-১০ মিনিট যাওয়ার পরে রাস্তার বাম পাশে স্যারের নির্দেশ অনুযায়ী গাড়িগুলো আবার থেমে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি দেখতে পেলাম আমার গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তার বাম পাশ থেকে ডান পাশে একজন ব্যক্তিকে চোখ এবং হাত বাঁধা অবস্থায় অন্য দুইজন রাস্তা পার করে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর একটা গুলির শব্দ শুনতে পাই। পুনরায় আমাদের গাড়ি চলতে থাকে। এরপর বাঁশঝাড়ের মতো একটা জায়গায় গাড়ি থামে। প্রায় ৭-৮ মিনিট পরে একটি গুলির শব্দ শুনতে পেলাম।

জবানবন্দিতে এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, এরপর জিয়া স্যারের নির্দেশে আবারও আমাদের গাড়ি চলতে থাকে। পথে আরও ২-১ জায়গায় গাড়ি অল্প সময়ের জন্য থেমেছিল। তবে তখন আমার গাড়ি থেকে কেউ নামেনি। গাড়িতে এসে মেজর তরিকুল আমাকে বলেন, ‘স্যার, জিয়া স্যার আমাকে একজন ব্যক্তিকে মারতে বলেন, আমি মারি নাই। তবে স্যারের সঙ্গে থাকা দুইজন ব্যক্তি ওই ব্যক্তিকে মারেন।’ তিনি (জিয়াউল আহসান) মেজর তরিকুলকে গালমন্দ করেন। পরবর্তীতে আমার গাড়িসহ অন্যান্য গাড়ি সামনে অগ্রসর হয়। আমাদের চারজনকে বহন করা গাড়িটি ক্যান্টনমেন্টে যার যার বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। পরে ৩-৪ দিনের মধ্যে জাতীয় পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি, গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ২-৩ জন ব্যক্তির লাশ উদ্ধার হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন