আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নবীন ফ্যাশন বন্ধের ঘটনায় আদালতকে যে ব্যাখ্যা দিলেন ওসি মর্তুজা

স্টাফ রিপোর্টার

নবীন ফ্যাশন বন্ধের ঘটনায় আদালতকে যে ব্যাখ্যা দিলেন ওসি মর্তুজা

রাজধানীর মগবাজারের বিশাল সেন্টারে নবীন ফ্যাশনে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার ঘটনায় আদালতে ব্যাখ্যা দিয়েছেন ওসি গোলাম মর্তুজা। তিনি লিখিত জবাবে জানান, আকর্ষণীয় অফারকে কেন্দ্র হঠাৎ অতিরিক্ত ভিড় ও বাইকারদের চাপের কারণেই ওই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

রোববার (২৯ মার্চ) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের আদালতে হাজির হয়ে এ ব্যাখা দেন তিনি। ওসি আদালতকে বলেন, আদালত যদি মনে করে পুলিশের কোনো ভুল ছিল, তাহলে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা চাইছেন এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।

বিজ্ঞাপন

ওসি আদালতকে জানান, মগবাজারের বিশাল সেন্টারে প্রায় ৩ বছর ধরে “নবীন ফ্যাশন” নামে একটি পোশাকের দোকান ব্যবসা চালাচ্ছে। তারা কম দামে পণ্য বিক্রি করে এবং বিভিন্ন সময় আকর্ষণীয় অফার দেয়। একই মার্কেটে আরও কয়েকটি পুরনো দোকান আছে, যেমন- প্রিন্স ফ্যাশন, কিংস ফ্যাশন ও আল মোস্তফা। যারা অনেক দিন ধরে ব্যবসা করছে।

২০ মার্চ ২০২৬ তারিখে নবীন ফ্যাশন একটি বড় অফার দেয় ২টি পাঞ্জাবি কিনলে ৪টি ফ্রি, বাইকারদের জন্য ইঞ্জিন অয়েল ফ্রি, এমনকি রিকশা ভাড়াও ফ্রি। তারা ফেসবুক ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে এই প্রচার করে। এতে করে জুমার নামাজের আগ থেকেই দোকানের সামনে প্রচুর ভিড় জমে যায়। প্রতি মুহূর্তে প্রায় ১০০–১২০টি মোটরসাইকেল আসা-যাওয়া করতে থাকে।

এই অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দোকানের সামনে, পার্কিংয়ে এবং আশেপাশের দোকানগুলোর সামনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। নবীন ফ্যাশন এই চাপ সামাল দিতে না পেরে বিকেল ৫টার দিকে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে তাদের অফার বন্ধ করে দেয় এবং দোকানের সামনে শাটার নামিয়ে দেয়। কিন্তু তখনও ক্রেতারা পিছনের গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে, ফলে পরিস্থিতি আরও অগোছালো হয়ে যায়।

এ অবস্থায় মার্কেটের সিকিউরিটি গার্ড বিষয়টি কমিটির সভাপতি তৈয়ব আলী, সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন মাইকেলসহ অন্যদের জানায়। তারা দোকানে গিয়ে নবীন ফ্যাশনের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। তখন সেখানে থাকা পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করার জন্য তাদের বাইরে নিয়ে আসে।

ঈদ উপলক্ষে ওই মার্কেটে আগেই পুলিশ মোতায়েন ছিল। দায়িত্বে থাকা এএসআই আরিফুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, দোকানের সামনে ও ভেতরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, ক্রেতারা বিশৃঙ্খলভাবে ঢোকার চেষ্টা করছে। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ভিড় সরিয়ে দেন। তার কারণে কোনো মারামারি, ভাঙচুর বা লুটপাট হয়নি।

ওসি জানান, তিনি ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি জানতে থাকেন। পরে ফোনে এএসআই আরিফুল ইসলাম থেকে বিস্তারিত জানেন। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আছে জেনে তিনি অতিরিক্ত ফোর্স না পাঠিয়ে পরে আরেকজন অফিসারকে পাঠান।

পরে তিনি নবীন ফ্যাশনের মালিক এনামুল হাসান নবীনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং দোকান খোলার অনুরোধ করেন। কিন্তু মালিক বলেন, তার ঢাকায় অনেক দোকান আছে, এই দোকান নিয়ে তিনি ভাবছেন না এবং সেদিন আর দোকান খুলবেন না। রাতে ওসি নিজে ঘটনাস্থলে যান। দোকান বন্ধ থাকায় নবীন ফ্যাশনের কাউকে না পেয়ে মার্কেট কমিটির লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। পরে থানায় একটি জিডি করা হয়।

এরপর রাতে দোকানের মালিক ফোন করে অভিযোগ করেন, প্রিন্স ফ্যাশনের মালিক তার কর্মচারীদের হুমকি দিয়েছেন। ওসি তাকে বলেন, আগে মার্কেট কমিটির কাছে অভিযোগ করতে, প্রয়োজনে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।

ওসি আরও বলেন, সংবাদ সম্মেলনে নবীন ফ্যাশনের মালিক দাবি করে বলেছেন “মার্কেট কর্তৃপক্ষের সাথে পারবেন না তিনি, তারা প্রধানমন্ত্রীর লোক”—এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

পরদিন ২৬ মার্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, পুলিশ উপস্থিতিতে নবীন ফ্যাশনের দোকান খুলে দেওয়া হয় এবং নিরাপদে ব্যবসা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়।

ওসি জানান, ঘটনার সময় যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে মার্কেট কমিটির সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সিকিউরিটি ইনচার্জ এবং নবীন ফ্যাশনের ম্যানেজার ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলা ও চাপ থাকায় পরিস্থিতি সংবেদনশীল থাকে। এই ঘটনাতেও হঠাৎ বড় ভিড় হওয়ায় ভয় ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। তবে পুলিশ ধৈর্য ও পেশাদারিত্ব বজায় রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।

নবীন ফ্যাশনের একটি পাঞ্জাবির দোকান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় গত বুধবার একই আদালত তাকে তলব করে এ বিষয়ে ব্যাখা দিতে তিনদিন সময় দেয় আদালত। একইসঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে দোকানটি খুলে দিতে ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদেশে বলা হয়, একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়- মগবাজারের বিশাল সেন্টার মার্কেটের ‘নবীন’ ব্র্যান্ডের একটি পাঞ্জাবির দোকানে একদল লোক পুলিশসহ উপস্থিত হয়ে বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ঘটনাস্থলে কিছু ব্যক্তিকে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতে দেখা গেলেও পাশে থাকা পুলিশ সদস্যদের নির্লিপ্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

এ ঘটনায় আদালতের মন্তব্য , পুলিশের এমন নির্লিপ্ততা জনমনে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। কেন এ ধরনের আচরণ আইনবহির্ভূত ও পেশাদারিত্ববিরোধী হিসেবে ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে হাতিরঝিল থানার ওসিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘নবীন’ ব্র্যান্ডের পাঞ্জাবির দোকানটি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে খুলে দেওয়ার জন্যও ওসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিস্তারিত নাম-পরিচয় আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন