জুলাই আন্দোলনের সময় নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে পুলিশ বিধ্বংসী অ্যামুনেশন (বুলেট) ৭.৬২ ব্যবহার করেছে। এছাড়া সারা দেশে মোট তিন লাখ পাঁচ হাজার ৩১১ রাউন্ড গুলি ব্যবহার করা হয়। এলএমজি, এসএমজি, চাইনিজ রাইফেল, শটগান, রিভলভার, পিস্তলসহ বিভিন্ন মারণাস্ত্র দিয়ে এসব গুলি চালানো হয়। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরে ৯৫ হাজার ৩১৩ রাউন্ড ছোড়া হয়। এছাড়া ৪০ জেলায় মরণাস্ত্র ব্যবহার করে পুলিশ। সারা দেশে ৫০টির বেশি জেলায় পুলিশ ছাত্রজনতার ওপর গুলি চালায়।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্কে এসব তথ্য ওঠে আসে।
এদিন জুলাই বিপ্লবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কাদেরসহ সাত জনের বিরুদ্ধে পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম। এসময় উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
যুক্তিতর্কে তামীম বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আমাদের রিপোর্ট দিয়েছে, জুলাই আন্দোলনে বিধ্বংসী অ্যামুনেশন ৭.৬২ অ্যামুনেশন ব্যবহার করা হয়েছে। এটি একটি হাইলি লেথাল অ্যামুনিশন, যেটা সাধারণত আর্মিরা ব্যবহার করে। এ আন্দোলনে পুলিশ এটি আন্দোলনকারীদের ওপরে ব্যবহার করেছে। এই অ্যামুনিশন সাধারণত একজন সিভিলিয়ানের পক্ষে কেনা বা পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না। এই ধরনের রিপোর্ট জাতিসংঘও প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, তারা বেশ কিছু মেডিকেল হাসপাতালে গিয়েছে। যে সব ডাক্তাররা এই গুলিবিদ্ধ রোগীদের চিকিৎসা করেছে তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, তাদের রিপোর্ট কালেক্ট করেছে সেখান থেকে তারা দেখতে পেয়েছে যে এ আন্দোলনে একটা বিশালসংখ্যক এই ৭.৬২ এমএম বুলেট নিহতদের শরীরে তারা পেয়েছে।
তামীম বলেন, ইউএনএইচসিআর তাদের নিজস্ব এই আর্মস এক্সপার্ট এবং আর্মস ফরেনসিক এক্সপার্টদের দিয়ে তারা এই সব রিপোর্টস পরীক্ষা করিয়েছে। তারা রিপোর্ট দিয়েছে যে এই ধরনের বিশেষায়িত বুলেট এবং অস্ত্র এই আন্দোলনে পুলিশ এ আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যবহার করেছে।
পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশন যুবলীগের সভাপতি ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মইনুল আহসান খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনানের দায় তুলে ধরা হয়। প্রসিকিউশন তুলে ধরেছে, যুবলীগের সভাপতি পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক নিখিল শেখ হাসিনার নির্দেশে আন্দোলন দমনে সারাদেশে তাদের অধস্তন নেতাকর্মীদের দিয়ে ছাত্রজনতার ওপর হামলা চালিয়েছে। যুবলীগ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের একদম রুট লেভেলের কর্মীদের পর্যন্ত নির্দেশনা দিয়ে প্রত্যেকটি জায়গায় আন্দোলনকারীদের ওপরে হামলা করেছে। সশস্ত্র অবস্থায় গুলি করেছে এবং হত্যা করেছে। যুবলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বক্তৃতা, বিবৃতি দিয়ে এই তাদের অধস্তন যুবলীগের নেতাকর্মীদেরকে এই আন্দোলনে আক্রমণে, উসকানি দিয়েছে। কাদেরের সঙ্গে পরশের ফোনালাপে আন্দোলন দমন ও নির্দেশনার কথা শোনা যায়।
প্রসিকিউশন আরো তুলে ধরে, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম এবং সম্পাদক ইনান এই দুইজনও ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথোপকথনে সাদ্দাম অনুমতি চাইলেন যে, আপনারা যদি রাজনৈতিকভাবে আমাদের মোকাবিলা করতে বলেন আমরা প্রস্তুত আছি। ১৪ জুলাই সাদ্দাম বলল যে, ছাত্রলীগ প্রস্তুত, ছাত্রলীগ দেখে নেবে; এর শেষ দেখে ছাড়বে। এরপর ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর হামলা চালানো হয়। ঢাকার বাইরে প্রত্যেকটি জেলায় জেলায় ছাত্রলীগের এই নির্দেশনা পৌঁছে গেছে এবং ওই প্রত্যেকটি জেলা ও উপজেলার কর্মীরাও এই নির্দেশনা মোতাবেক যার যার এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ করেছে। তারা নিরস্ত্র ছাত্রদের উপরে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে ও জখম করে এবং এর মাধ্যমে তারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। সুতরাং সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি এই চার আসামির উপরেই বর্তায়।
যুক্তিতর্কের পরবর্তী আগামীকাল আবার তুলে ধরা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


