২০ জানুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এজেন্ডার অংশ হিসেবে প্রায় সব বিদেশি সহায়তা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী কয়েক কোটি ডলারের তহবিল স্থগিত হয়ে যায়।
দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমেরিকা আর অন্ধভাবে অর্থ বিতরণ করবে না। কারণ, এ ধরনের অনুদানের কোনো সুফল এ দেশের জনগণ ভোগ করে না। এই সহায়তা দেওয়া হয় এ দেশের পরিশ্রমী করদাতাদের করের অর্থ থেকে। তাই করদাতাদের পক্ষে বৈদদেশিক সাহায্য পর্যালোচনা এবং পুনর্গঠন করা কেবল সঠিক কাজ নয়, এটি একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা।
বিশ্বের এককভাবে বৃহত্তম দাতা দেশের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা বিশ্বজুড়ে অনেকের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করেছে। হতবাক করেছে সহায়তা গ্রহণকারী দেশগুলোকে। বিভিন্ন সহায়তা প্রতিষ্ঠানগুলোও সতর্ক করে বলেছে, ট্রাম্পের এ উদ্যোগ বিশ্বে অনেকের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে। ওয়াশিংটন ২০২৩ সালে প্রায় ১৮০টি দেশে ৭২ বিলিয়ন বা ৭ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সহায়তা বিতরণ করেছে।
ট্রাম্পের এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ আগামী ৩ মাস। এই সময়ের মধ্যে এই স্থগিতাদেশ নিয়ে সব ধরনের আলোচনা-পর্যালোচনা করা হবে, যাতে আগামীতে এটি বন্ধ, পরিচালনা বা চালিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হয়। এমনটাই জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
এদিকে, গত শুক্রবার রুবি’র পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উন্নয়ন, নিরাপত্তা সহায়তা এবং অন্যান্য প্রচেষ্টায় সহায়তাকারী আমেরিকান প্রকল্পগুলো বন্ধ করতে বিশ্বব্যাপী দূতাবাসগুলোতে বার্তা পাঠানো হয়েছে।
তবে, যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের মতো চরম খাদ্যঝুঁকি ও দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত দেশগুলোতে জরুরি খাদ্য কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া, ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল এবং মিসরকে সামরিক সহায়তাও বজায় থাকবে। এ ছাড়া, আরও বেশ কিছু সহায়তা কার্যক্রমকে স্থগিতাদেশের বাইরে রাখতে সম্মত হয়েছেন রুবিও। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও খাদ্য সরবরাহ করা সংশ্লিষ্ট মানবিক কর্মসূচির জন্য অস্থায়ী তহবিলের অনুমতি দিতে চান তিনি।
তবে আকস্মিক ওই স্থগিতাদেশ বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে থাকা মানুষকে ‘চরম সংকটে ফেলেছে এবং এর ফলে অনেকে মারাও যেতে পারেন, এমনটাই বলেছেন সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র ফেলো র্যাচেল বোনিফিল্ড।
২০২৩ সালে দেওয়া বিদেশি সহায়তা তহবিলের খতিয়ানে দেখা গেছে, সহায়তার একটি বড় অংশই অর্থনৈতিক সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় ৫৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন বা প্রায় ৫ হাজার ৯৯০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ইউক্রেন একাই প্রায় ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪৪০ কোটি ডলারের সহায়তা পেয়েছে। কাছ থেকে এসব সহায়তা পেয়েছে ইউক্রেন।
ইউক্রেনের পর দ্বিতীয় গ্রহীতা দেশ জর্ডান, ইউএসএআইডি’র মাধ্যমে ৭৭০ মিলিয়ন বা ৭৭ কোটি ডলার অর্থতৈনিক সহায়তা পেয়েছে। ইয়েমেন এবং আফগানিস্তান পেয়েছে যথাক্রমে ৩৫৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন (৩৫ কোটি ৯৯ লাখ) এবং ৩৩২ মিলিয়ন বা ৩৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের সহায়তা।
এসব সহায়তার পাশাপাশি একই বছর আমেরিকার প্রশাসন বিভিন্ন মিত্র দেশকে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন (৮২০ কোটি) ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই পেয়েছে ইসরাইল ও মিসর। এ সামরিক সহায়তার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের গাজায় ভয়ংকর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর ইসরাইলকে আরও ১৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন (১ হাজার ৭৯০ কোটি) ডলারের অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা দিয়েছে আমেরিকা।
আমেরিকার সামরিক সহায়তার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গ্রহীতা মিসর। ১৯৭৮ সালে দুই দেশের মধ্যে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি সই হওয়ার পর থেকে মিসরকে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন বা ১২০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে তারা।
সহায়তা বন্ধ হেলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়বে এইডস প্রতিরোধে ২০০৩ সালে চালু করা ‘প্রেসিডেন্স ইমার্জেন্সি প্ল্যান ফর এইডস রিলিফ প্রকল্প। এ পর্যন্ত এ প্রকল্পে প্রায় ১২০ বিলিয়ন (১২ হাজার কোটি) ডলারের তহবিল সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি সহায়তা কার্যক্রম স্থগিত করে ট্রাম্পের নির্দেশের কড়া সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ আর মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংস্থাগুলো। কেউ কেউ উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। কেউবা আবার দ্রুত খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

