শিক্ষা বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ চান দেশের ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী। দেশের ৬৭ দশমিক ৭ শতাংশ তরুণ শিক্ষার্থী মনে করেন, দেশের শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বা দুর্বল দিক হলো দুর্নীতি ও তহবিলের অপচয়। ৫০ দশমিক ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী রাজনৈতিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুতর বাধা বলে মনে করেন।
শিক্ষা বাজেট নিয়ে শিক্ষা অধিকার সংসদের পরিচালিত জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এই জরিপের ফল ও সুপারিশমালা তুলে ধরেন শিক্ষা অধিকার সংসদের সদস্য সচিব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন।
‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন, শিক্ষার্থীদের মতামত ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই জরিপে দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৩৫০ শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা শিক্ষা বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী। জরিপে ১৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চারটি গ্র্যাজুয়েট লেভেল মাদরাসা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট উত্তরদাতার মধ্যে ৬২ দশমিক তিন শতাংশ তরুণ শিক্ষার্থী শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ বা তারও বেশি বরাদ্দ প্রত্যাশা করেন। ৫৫ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি উত্তরদাতা মনে করেন, শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী ও মজবুত করতে প্রাথমিকপর্যায়ে অধিক বিনিয়োগ প্রয়োজন, কারণ প্রাথমিক শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ করে এবং এই স্তর ভঙ্গুর থাকলে উচ্চশিক্ষা বা পেশাদার শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন অসম্ভব।
৩০ দশমিক তিন শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করেন, শিক্ষা খাতের উন্নয়নে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা মূলত গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা খাতে অধিক বিনিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছেন ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। তারা এই খাতকে প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার মধ্যকার সেতু হিসেবে মনে করেন। তবে এক-চতুর্থাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট স্তরে বৈষম্য না করে শিক্ষাব্যবস্থার সব স্তরে সমানভাবে বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা উচিত।
১২ দফা সুপারিশ
জরিপে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সরকারের কাছে ১২ দফা সুপারিশ তুলে ধরে শিক্ষা অধিকার সংসদ। এর মধ্যে রয়েছে জিডিপির ৫-৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ নিশ্চিত এবং আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি, প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, ‘জাতীয় শিক্ষক নিয়োগ কমিশন (এনটিসি)’ গঠন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তকরণ, স্বতন্ত্র ও যুগান্তকারী শিক্ষক বেতন স্কেল প্রবর্তন, বাধ্যতামূলক পেশাগত প্রশিক্ষণ তহবিল গঠন, জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল (এনআরআইএফ) গঠন, মাধ্যমিক ও স্কুলপর্যায় থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোডিং, ডেটা সায়েন্স এবং বিজ্ঞাপন, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) শিক্ষার প্রসারে ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
সুপারিশমালায় আরো বলা হয়, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ (টিভিইটি) শিক্ষাকে আধুনিকায়ন, ল্যাবরেটরি সংস্কার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কারিকুলাম রি-ডিজাইনের জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ ও বিশেষ অনুদান দিতে হবে। সেই সঙ্গে চরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার বিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষকদের পোস্টিং নিতে উৎসাহিত করার জন্য বাজেটে ‘বিশেষ গ্রামীণ ভাতা’ বা ‘বিশেষ অঞ্চল শিক্ষা ভাতা’ চালু করা, শিক্ষা বাজেট তদারকি ও জবাবদিহি সেল গঠন, ডিজিটাল প্রকিউরমেন্ট ও অডিট ব্যবস্থা এবং সবশেষ জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা জরুরি।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

