আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিটিসিএলের ৫জি প্রকল্প

বুয়েট শিক্ষকদের মূল্যায়ন দেখার অপেক্ষায় সরকার

আল-আমিন

বুয়েট শিক্ষকদের মূল্যায়ন দেখার অপেক্ষায় সরকার

নানা জটিলতা পেরিয়ে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ বর্তমানে চলমান। অপতথ্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দেশীয় ও বেসরকারি কোম্পানির চাপ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রকল্পটির স্বাভাবিক অগ্রগতি একাধিকবার ব্যাহত হয়েছে।

এছাড়া বন্দরে যন্ত্রপাতি আটকে থাকা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর চিঠিকে কেন্দ্র করেও সৃষ্টি হয় ধোঁয়াশা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রকল্পের কারিগরি পরীক্ষার কাজ শেষ পর্যায়ে এবং বুয়েটের শিক্ষকদের অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে তারা।

বিজ্ঞাপন

নিরবচ্ছিন্ন আধুনিক টেলিযোগাযোগের সুবিধা, উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এবং ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ২০২২ সালে এই প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের ব্যান্ডউইথ চাহিদা মোকাবিলায় সক্ষম একটি শক্তিশালী ব্যাকবোন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাই ছিল প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। তবে নানা চাপ ও বিতর্কের কারণে এখনো প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। দরপত্র না পেয়ে প্রকল্পকে ভেস্তে দিতে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে সামিটের বিরুদ্ধে। এছাড়া দরপত্র পেতে পলকের কাছেও তদবির করে একাধিক প্রতিষ্ঠান। প্রকল্প যাতে বাস্তবায়ন না হয়, এজন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলো বিটিসিএলকে মার্কেট আউট করতে চেয়েছিল।

প্রকল্পের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব আমার দেশকে জানান, বুয়েটের শিক্ষকগণ টেস্টিংয়ে কাজ করছেন। আমরা তাদের অ্যাসেসমেন্টের জন্য অপেক্ষা করছি। দ্রুতই কমিটির রিপোর্ট পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগযোগ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মুখলেসুর রহমান জানান, প্রকল্পের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

বিটিসিএল সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ১০০ জিবিপিএস, জেলা শহরে ৩০০ জিবিপিএস এবং মহানগরীতে সর্বোচ্চ ১,০০০ জিবিপিএস সক্ষমতার অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হবে। এর ফলে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর সক্ষমতা বহুগুণে বাড়বে। বর্তমানে দেশে ব্যান্ডউইথ ব্যবহার প্রায় ৩৫ টেরাবাইট, যা চলতি বছরের মধ্যেই ৫০ টেরাবাইটে পৌঁছাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী পাঁচ বছরে এই চাহিদা চার থেকে পাঁচ গুণ বাড়বে।

সূত্র আরো জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিটিসিএল দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের প্রায় ৩০ শতাংশ বা ১১,২৫০ জিবিপিএস সরবরাহে সক্ষম হবে, যা আগামী এক দশকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আধুনিক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এই ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিসিএলের সক্ষমতা বাড়াবে এবং বেসরকারি এনটিটিএন অপারেটরদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি মোবাইল অপারেটরসহ অন্যান্য সেবাদাতারা উন্নতমানের ব্যাকহল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারবে, যা দেশের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণ সাশ্রয়ী মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পাবে।

প্রকল্পটির মোট অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১,০৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪৬৩ কোটি টাকা সরাসরি যন্ত্রপাতি কেনার জন্য বরাদ্দ ছিল। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে চীনের হুয়াওয়ে টেকনোলজিস ৩২৬ কোটি টাকায় যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ পায়, যা অনুমোদিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা কম। তবে দরপত্র প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন ও জটিলতার মুখে পড়ে।

এদিকে, রেডিনেস প্রকল্পে দুদকের চলমান তদন্ত ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়। গত ১৮ জুন দুদকের তৎকালীন সচিব ইয়াসমিন ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিবকে পাঠানো এক চিঠিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় পিপিএ ও পিপিআর লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে প্রকল্পের অবশিষ্ট কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানান। যদিও চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে এলসি খোলা যন্ত্রপাতির খালাস প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে দুদকের কাছে একটি আধাসরকারি চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ জানান বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।

অন্যদিকে, আর্থিক প্রস্তাব উন্মোচন নিয়েও অভিযোগ ওঠে, দরপত্রদাতাদের পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই সভা আয়োজন করা হয়েছিল। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, আর্থিক প্রস্তাব উন্মোচন বিষয়ে প্রথম চিঠি ২০২৩ সালের ১৮ অক্টোবর পাঠানো হয়। পরে ৬ নভেম্বর জারি করা চিঠিতে ৮ নভেম্বর সভার তারিখ নির্ধারণ করা হয় এবং আগের আমন্ত্রণপত্রের প্রসঙ্গও সেখানে উল্লেখ ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সময় স্বল্পতার অভিযোগ বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়।

সব মিলিয়ে নানা বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিটিসিএলের ফাইভ-জি প্রকল্পটি ধীরে হলেও এগিয়ে চলেছে। এখন বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট পাওয়া গেলে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানা যাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন