জুলাই বিপ্লবের পর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) ছাত্ররাজনীতির নতুন দৃশ্যপট তৈরি হয়। ক্যাম্পাসে এখন সক্রিয় ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়ন, জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ একাধিক ছাত্রসংগঠন। তবে এই বহুমতের পরিবেশ যতটা সহাবস্থানের, তার চেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তারের।
ছাত্রদলের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে একসময় যারা সাধারণ শিক্ষার্থী সেজে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চাইত, তাদের একটা অংশ এখন ছাত্রশক্তি করছে। এদিকে ছাত্রশক্তির অভিযোগ, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। ছাত্র ইউনিয়নের মতে, ছাত্রদল তুলনামূলক সহনশীল হলেও ছাত্রশক্তির একটি অংশ উগ্র আচরণ করে। একইসঙ্গে তারা কিছু লিখলে ছাত্রশিবির দিয়ে আক্রমণ করে বলে অভিযোগ ছাত্র ইউনিয়নের। ছাত্র ইউনিয়নের এই অভিযোগকে ‘ঈর্ষান্বিত অপপ্রচার’ বলে দাবি ছাত্রশিবিরের। ছাত্রদলকে অভিযুক্ত করে তারা বলেন, ছাত্রদলের প্রত্যক্ষ মদতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ শাকসু নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
৫ অগাস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়, ছাত্রশিবিরের আংশিক কমিটিও প্রকাশ্যে আসে। একইসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠক দিয়ে দলের কার্যক্রম চালাচ্ছে। চলতি মাসে জাতীয় ছাত্রশক্তিও তাদের আংশিক কমিটি দেয়। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কমিটি থাকলেও কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়।
স্বৈরাচার পতনের পর ছাত্র সংগঠনগুলোর হলকেন্দ্রিক রাজনীতি আগের মতো নেই। হলের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী মেধা, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাসহ কয়েকটি ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীদের সিদ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে কোনো ছাত্র সংগঠন হলের সিটকেন্দ্রিক বানিজ্যের সুযোগ পাচ্ছে না। তবে গত বছরের ১২ অক্টোবর নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শাহপরাণ হলের কয়েকটি সিট ছাত্রদলের নেতাকর্মীদেরও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। তখন হলে বরাদ্দকৃত সিটের তালিকা প্রকাশের দাবি জানালেও প্রশাসন তা করেনি। সেই অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যমে হল প্রাধ্যক্ষ্যের ভাষ্য ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আদেশে সিট বন্টন করা হয়েছে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ-মিছিলের ধরনও বদলেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকে দেশ ও ক্যাম্পাসের নানা ইস্যু নিয়ে কথা বলতেন। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপর প্রতিবাদমুখর শিক্ষার্থীদের সেই অংশটিও অনেকটা নিরব হয়ে গেছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।
এছাড়া ছাত্রসংগঠনগুলো, বিশেষ করে ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ শাকসু কেন্দ্রিক বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি পালন করলেও এখন কোনো ছাত্রসংগঠনকে আগের মতো এ ধরনের কার্যক্রমে দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি সাধারণ শিক্ষার্থীদের। একইসঙ্গে ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ শাকসু বানচালে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাঈম সরকার বলেন, শাকসু স্থগিত করার সকল প্রেক্ষাপট ইসলামী ছাত্রশিবির এবং তাদের সহযোগী প্রশাসনই রচনা করেছিল।
এদিকে ১২ জুন জাতীয় নাগরিক পার্টির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি আংশিক কমিটি দেওয়ার পর কমিটির নেতৃবৃন্দ নিয়ে সমালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল। তাদের দাবি, ৫ আগস্টের পর বর্তমান কমিটির ছাত্রশক্তি নেতারা সাধারণ শিক্ষার্থী সেজে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিতে নানা মিছিল-সভা-মানববন্ধন করতেন। সে সময় নিজেদের সাধারণ শিক্ষার্থী দাবি করা এসব শিক্ষার্থী এখন ছাত্রশক্তির কমিটিতে পদে আছেন, যা একপ্রকার ভণ্ডামি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক রাশিদ আবরার বলেন, ৫ অগাস্টের পর নতুন প্রশাসন ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনগুলোর দলীয় ব্যানারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। ওই সময় শুধু ছাত্রশক্তির বর্তমান নেতৃবৃন্দই ক্যাম্পাসে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চায়নি, বরং ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের অনেকে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশও ক্যাম্পাসে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ চেয়েছিল। তবে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে যে রাজনীতি, সেটা থাকুক বলে তারা চেয়েছিল। পরে যখন প্রশাসন সব সংগঠনের সঙ্গে বসে ছাত্ররাজনীতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন সবাই ছাত্ররাজনীতি করার সুযোগ পাচ্ছে। সবার জন্যই ছাত্ররাজনীতি উন্মুক্ত।
এদিকে ক্যাম্পাসে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক উপস্থিতি তুলনামূলক সীমিত বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীদের একটা অংশ। ৫ অগাস্টের পর সংগঠনটি কয়েকজন সংগঠক ও কর্মী দিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছিল। সম্প্রতি ক্যাম্পাস ও জাতীয় রাজনীতির নানা ইস্যুতে সংগঠনটি মাঠপর্যায়ে কোনো কার্যক্রম না দেখালেও বেশিরভাগ সময় অনলাইনে বিবৃতি দেওয়ার মাধ্যমে দলীয় কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে শিক্ষার্থীদের ভাষ্য।
ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আল আমিন বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আবাসন সংকট ও শিক্ষার্থীদের অধিকার সংক্রান্ত বিষয়সহ নানা ইস্যুতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে মত দিচ্ছেন। তবে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে পুরোপুরি ভয়মুক্ত পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি বলে মনে করেন এই শিক্ষার্থী।
তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে কেউ কেউ রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে। আবার কেউ ভিন্নমত দমনে গুপ্ত ট্যাগ ব্যবহার করছে। কোনো মতামত নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের বিপেক্ষ গেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে সেই শিক্ষার্থী অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ বা ট্রলের শিকার হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের কথা বিবেচনা করে এখন প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধা বোধ করেন।
শাবি ছাত্রদলের সভাপতি রাহাত জামান বলেন, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন নিজেদের আদর্শ ও কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে চাইবে। সে হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্ররাজনীতি প্রতিযোগিতামূলক হলেও সহনশীল। আমরা অপরের ভিন্নমতকে সম্মান জানাই। ছাত্রশক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ছাত্রশক্তির বর্তমান নেতৃত্বের অনেকেই অতীতে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু এখন তারাই ছাত্ররাজনীতি করছেন। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
শাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাসুদ রানা তুহিন বলেন, আমরা কোনো ছাত্রসংগঠনকে শত্রু মনে করি না। তবে আমরা ছাত্রলীগ আমলের মতো ভিন্ন মত ও পথের হলেই দমন-নিপীড়ন, হল দখল, সন্ত্রাস, মাদক ও ত্রাসের রাজনীতি কারও থেকে আশাও করি না। কিন্তু আমরা দেখেছি, এ ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের প্রত্যক্ষ মদদে শাকসু স্থগিত করে দেওয়া হলো। এ ধরনের শিক্ষার্থীদের অধিকার হরনের রাজনীতি অন্তত চব্বিশের বাংলাদেশে আমরা দেখতে চাই না।
শাকসুকেন্দ্রিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, ছাত্রশিবির কোনো উপলক্ষকে সামনে রেখে নয়, বরং নিয়মিত কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এসব কাজ করে। ছাত্রশিবির এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত দেড় বছরে শতাধিক ছাত্রকল্যাণমূলক কাজ করেছে। ২০২২ সালের বন্যা-পরবর্তী ফ্যাসিস্ট আমলেও এক লাখ টাকার শিক্ষাবৃত্তি, পরে দুই লাখ টাকার শিক্ষাবৃত্তি দিয়েছে। এ ধরনের কর্মসূচি সামনেও অব্যাহত থাকবে।
জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক রাশিদ আবরার বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিতে সহনশীল অবস্থা নেই। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে বিভিন্নভাবে ভিন্নমতের মানুষদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এ জন্য তারা অনলাইন বুলিং থেকে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা- সবই ব্যবহার করছে।
ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠক নাজনীন লিজা বলেন, আমরা কিছু লিখলে ছাত্রশিবির তাদের ‘বট বাহিনী’ দিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করে। ছাত্রদল সহনশীল, রিজনীং করার চেষ্টা করে। ছাত্রশক্তির একটা অংশ সহনশীল, আরেকটা অংশ খুবই উগ্র আচরণ করে। তিনি আরো বলেন, ক্যাম্পাসে আমরা সহনশীল, মুক্ত সংস্কৃতির রাজনীতি চাই। কোন একটা সংগঠন কিছু বললে সেটা না বুঝে গণহারে আক্রমণ করার রাজনীতি চাই না। যুক্তিসহকারে বিরোধিতা করার যোগ্যতা অর্জন করুক অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো, এটাই চাই।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতি প্রত্যাশা থাকবে, আধিপত্য বিস্তারের জন্য ক্যাম্পাসকে অশান্ত বা অস্থিতিশীল করে অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ব্যাহত করবে না। আগে আমরা দেখেছি হল দখল, ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা। এগুলো থেকে বেরিয়ে এসে ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রো-স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশনে রূপান্তরিত হওয়াই এখন জরুরি। আর তা হলেই শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কল্যাণ হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


