জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) আয়োজিত কর্মসূচি নিয়ে দায়সারাভাবের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দিবসটি আলোকসজ্জা, ফিস্ট মিল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী ও দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করা হলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত পরিসরের আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো আয়োজন ছিল না।
বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে একটি র্যালির মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। পরে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের কনফারেন্স কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শহীদ আব্দুল কাইয়ুমকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হয়। বাদ জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও তাবারুক বিতরণের আয়োজন করা হয়।
তবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ দিবসে ক্যাম্পাসজুড়ে আলোকসজ্জা, শিক্ষার্থীদের জন্য ফিস্ট মিল, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা অংশগ্রহণমূলক কোনো কর্মসূচি না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন অনেক শিক্ষার্থী। তাদের অভিযোগ, মসজিদে তাবারুক বিতরণের ঘোষণা দেওয়া হলেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই তাবারুক পাননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জুবায়ের হাসান রাফাত বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিন। দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই দিবসটি উপলক্ষে আলোকসজ্জা, ফিস্ট, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও বিভিন্ন স্মারক কর্মসূচির মাধ্যমে ব্যাপক পরিসরে উদযাপন করা হয়েছে। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সে ধরনের কোনো আয়োজন দেখা যায়নি। সীমিত পরিসরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির মধ্যেই দিবসটি শেষ হয়েছে। একটি ‘স্টুডেন্ট ফার্স্ট’ নীতির বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আমরা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন প্রত্যাশা করেছিলাম।”
আরেক শিক্ষার্থী মো. ইকবাল বলেন, “দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করা হলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় পরিসরের কোনো আয়োজন চোখে পড়েনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া ও তাবারুক বিতরণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, পর্যাপ্ত তাবারুকের ব্যবস্থা না থাকায় সবাই তা পাননি। শুধু ‘স্টুডেন্ট ফার্স্ট’ বললেই হবে না, সেটির বাস্তব প্রতিফলনও থাকতে হবে।”
কুবি শাখা ছাত্রশক্তির সংগঠক নাঈম ভূইয়া বলেন, “যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ওপর ভর করেই বর্তমান প্রশাসন দায়িত্বে এসেছে, সেই ঐতিহাসিক দিনটিই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবহেলিত হয়েছে। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিস্ট, আলোকসজ্জা, মননশীল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনে দিবসটি উদযাপন করা হলেও কুবিতে আয়োজন ছিল অত্যন্ত ফ্যাকাশে ও দায়সারাভাবে। জুলাই শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়; এর চেতনা ও সংস্কৃতিচর্চাকে মর্যাদা দিয়ে ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে দিবসটি উদযাপন করা উচিত।”
কুবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোজাম্মেল হোসাইন আবির অনুষ্ঠানের পরিসর নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “প্রথম বছর মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠান হয়েছে, দ্বিতীয় বছরে এসে বদ্ধ ঘরে হচ্ছে। সামনে হয়তো ছোট্ট কক্ষেই আটকা পড়বে কুবির জুলাই।” তিনি জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ারও সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এম. শরীফুল করিম বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম বড় অর্জন ছিল তরুণ সমাজের জেগে ওঠা। সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলেও তারা রাজপথ ছাড়েনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, অন্যায়কে বাঙালি জাতি কখনো মেনে নেয় না।”
তিনি আরও বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে শিক্ষার্থীদের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।”
তবে শিক্ষার্থীদের একাংশের দাবি, শহীদদের স্মরণে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বৃহত্তর পরিসরে আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও স্মারক কর্মসূচির ব্যবস্থা করা হলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের তাৎপর্য ও মর্যাদা আরও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হতো।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

