শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটি ক্ষমতায়নের সিদ্ধান্ত জনবিরোধী: ছাত্র অধিকার পরিষদ

শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটি ক্ষমতায়নের সিদ্ধান্ত জনবিরোধী: ছাত্র অধিকার পরিষদ

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব বেসরকারি ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়ার উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা মেধাভিত্তিক ও তুলনামূলক স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা পরিবর্তন করে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে দেশে আবারও স্বজনপ্রীতি, অর্থের বিনিময়ে চাকরি ও অনিয়মের সংস্কৃতি ফিরে আসতে পারে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটি ক্ষমতায়নের সিদ্ধান্ত ‘জনবিরোধী’। বেকার তরুণদের নিয়ে ‘তামাশা’ করা হলে এর পরিণতি ভালো হবে না।

মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতারা এসব কথা বলেন। শিক্ষক নিয়োগব্যবস্থার পাশাপাশি সরকারি চাকরির শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, ক্যাম্পাসে অস্থিরতা নিরসন, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি সংকট সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের কাছে দাবি তুলে ধরেন তারা।

বিজ্ঞাপন

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি নাজমুল হাসান বলেন, কোটার চেয়েও বড় একটি ‘ক্যান্সার’ হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ। তার দাবি, ২০১৫ সাল থেকে এনটিআরসিএর মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিকভাবে সুপারিশ করা হচ্ছে। এমন একটি প্রক্রিয়া হঠাৎ পরিবর্তনের উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ চালু হলে অতীতে দেখা ‘মামা-চাচা’ ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি আবারও ফিরে আসতে পারে। অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা ছাত্রসমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

নাজমুল হাসান বলেন, গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে এনটিআরসিএ শুধু নিবন্ধন ও প্রত্যয়নের কাজে থাকবে এবং শিক্ষক নিয়োগে আর সুপারিশ করবে না। এরপরই ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি সামনে আসে।

তার অভিযোগ, পরদিন শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একটি সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সেটিকে অস্বীকার করা জনগণের সঙ্গে দ্বিমুখী আচরণের শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ৩ আগস্টের সভায় কীভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কী প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে- তা খতিয়ে দেখতে তদন্তের দাবি জানান ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সানাউল্লাহ হক বলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব এনটিআরসিএর কাছ থেকে নিয়ে ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়ার মাধ্যমে একটি দৃষ্টিকটু ও জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও ক্ষোভের মুখে সরকার হয়তো শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার মানসিকতা জনগণের নেই। সরকার পরিচালনায় হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হবে। সরকারের ভেতরে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করে সানাউল্লাহ হক বলেন, এমন কোনো সিদ্ধান্ত কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিতে পারে, যার ফলে জনগণের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়ে সরকারই বিপাকে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে কোনোভাবেই ব্যক্তিগত প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ করে দেওয়া যাবে না। শিক্ষকদের নিয়োগে যোগ্যতা ও মেধাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহতাব বলেন, ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ ‘দেশকে মেধাশূন্য করার প্রক্রিয়া’। শিক্ষার্থীদের বিরোধিতার কারণে হয়তো সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মাহতাব বলেন, ‘বেকারদের নিয়ে তামাশা করবেন না। তামাশা করলে বেকাররা ফুঁসে উঠবে এবং তার পরিণতি খারাপ হবে।’ সরকারকে হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে এনটিআরসিএর বর্তমান নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মেধাভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের বিষয়েও বক্তব্য দেন ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতারা।

সানাউল্লাহ হক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের ব্যবস্থা করার দাবি জানান। একই সঙ্গে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তাকেও দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়। প্রথমত, এনটিআরসিএর পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। প্রয়োজনে এনটিআরসিএর সঙ্গে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সমন্বয়ের মাধ্যমে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও চাকরিতে বিদ্যমান শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করতে হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চাকরির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার দাবি জানানো হয়। তৃতীয়ত, ক্যাম্পাসে চলমান অস্থিরতা নিরসনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান করতে হবে। এছাড়া দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানায় সংগঠনটি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন