চীন-বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সহযোগিতার ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শিক্ষা, গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারত্বকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ও গবেষক বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ সাইয়েদুল ইসলাম।
চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় সহযোগিতার এক দশক পূর্ণ হচ্ছে ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর। এত দিন দুই দেশের সহযোগিতায় সড়ক, সেতু, বন্দর, রেলপথ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো অবকাঠামোগত প্রকল্প গুরুত্ব পেলেও আগামী দিনে শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নকে আরো বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ও গবেষক মোহাম্মদ সাইয়েদুল ইসলাম। তার মতে, অবকাঠামো দুই দেশের মধ্যে ভৌত যোগাযোগ বাড়ায়, আর শিক্ষা তৈরি করে জ্ঞান, দক্ষতা ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের সেতুবন্ধ।
বৃত্তিতে বদলে গেছে শিক্ষাজীবন
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাইয়েদুল ইসলাম জানান, ২০১৮ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য চীনে যাওয়ার আগে সীমিত সামর্থ্যের পরিবারের একজন তরুণ হিসেবে বিদেশে পড়াশোনা করা তার কাছে ছিল দূরবর্তী স্বপ্ন। চীনের সরকারের বিআরআই-সংশ্লিষ্ট সিল্ক রোড বৃত্তির সহায়তায় তিনি জিয়াংসি ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ পান।
পরবর্তী সময়ে চীনা সরকারের বৃত্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি। বর্তমানে চীনের ফুজিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তার মতে, এই অভিজ্ঞতা দেখায়, শিক্ষার সুযোগ কীভাবে কূটনৈতিক সদিচ্ছাকে মানবসম্পদ উন্নয়নে রূপান্তর করতে পারে। একটি বৃত্তি শুধু একজন শিক্ষার্থীর বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করে না; বরং গবেষণা, পেশাগত দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন পথও খুলে দেয়।
চীনের বৃত্তিতে উপকৃত হাজারো বাংলাদেশি
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনা সরকারি বৃত্তি, সিল্ক রোড বৃত্তি, প্রাদেশিক ও পৌর পর্যায়ের বৃত্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অনুদান এবং বিশেষায়িত শিক্ষা কর্মসূচি। বৃত্তির ধরন অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি, আবাসন, চিকিৎসাবিমা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের জন্য আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন। ফলে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যেসব মেধাবী শিক্ষার্থীর বিদেশে পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাদের জন্য এসব বৃত্তি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে।
১৯৮১ সাল থেকে চীনা সরকারের বৃত্তি কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪ হাজার ৫০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উপকৃত হয়েছেন। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে এই বৃত্তি পেয়েছেন বাংলাদেশের ৮০ জন শিক্ষার্থী। এসব সংখ্যা শুধু বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উন্নত শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ।
দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা
বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির উপযোগী কর্মী তৈরি করার ক্ষেত্রে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১৯১টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী চীনে পড়াশোনা করেছেন। তাদের মধ্যে এশিয়ার শিক্ষার্থী ছিলেন ৬১ দশমিক ১ শতাংশ এবং আফ্রিকার ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮ শতাংশ চীনা সরকারি বৃত্তির আওতায় ছিলেন।
শিক্ষার্থী বিনিময়ের পাশাপাশি দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সহযোগিতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে বাংলাদেশের উন্নয়নসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।
শিক্ষাসহযোগিতার সাফল্য শুধু কতজন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেলেন, তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। শিক্ষার্থীরা কী শিখলেন, কী ধরনের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করলেন এবং স্নাতক শেষ করার পর কীভাবে সেই জ্ঞান কাজে লাগালেন—সেগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষার্থী থেকে দুই দেশের সেতুবন্ধ
চীনে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসা একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা বেসরকারি খাতে অবদান রাখতে পারেন। আবার চীনে পেশাগত জীবন গড়ে তোলা কোনো বাংলাদেশি গবেষণা সহযোগিতা বাড়ানো, দুই দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পরস্পরের বাজার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া কিংবা নতুন শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে পারেন।
তবে এ সহযোগিতাকে একমুখী জ্ঞান স্থানান্তর হিসেবে দেখা উচিত নয়। চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার অভিজ্ঞতা, উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক গবেষণাগারের সুবিধা দিতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা স্থানীয় বাজার, সামাজিক বাস্তবতা এবং উন্নয়নসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারেন। উভয় দেশের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারলেই শিক্ষাসহযোগিতা আরও কার্যকর হয়ে উঠবে।
আগামী দশকে পাঁচটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ
চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার পরবর্তী দশককে আরো কার্যকর করতে কয়েকটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন সাইয়েদুল ইসলাম।
প্রথমত, বৃত্তির সুযোগ বাড়ানো: মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বৃত্তি প্রদান, আবেদনের নিয়ম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যৌথ গবেষণা জোরদার: দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, যৌথ তত্ত্বাবধানে পিএইচডি, শিক্ষক বিনিময় এবং সমন্বিত গবেষণাগার গড়ে তুলতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিপ্রযুক্তি, জনস্বাস্থ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সরবরাহব্যবস্থা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও জলবায়ু সহনশীলতার মতো খাতে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
তৃতীয়ত, কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব: শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সনদের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারবেন।
চতুর্থত, সাবেক শিক্ষার্থীদের নেটওয়ার্ক তৈরি: চীনে পড়াশোনা করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়া, গবেষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম উন্নত করা সম্ভব।
পঞ্চমত, শিক্ষার মান নিশ্চিত করা: বৃত্তির পাশাপাশি কার্যকর একাডেমিক তত্ত্বাবধান, ভাষা শেখার সহায়তা, সাংস্কৃতিক অভিযোজন এবং মানসম্মত গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের স্নাতক সম্পন্ন করার হার, গবেষণার মান, কর্মজীবনের অগ্রগতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তিতে কর্মসূচির সাফল্য মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অবকাঠামোর বাইরে স্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি শিক্ষা
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু দুই দেশ কী পরিমাণ অবকাঠামো নির্মাণ করছে, তার ওপর নয়; বরং যৌথভাবে কতটা দক্ষতা ও সক্ষমতা তৈরি করতে পারছে, তার ওপরও। ভৌত যোগাযোগ সীমান্ত পেরিয়ে পণ্য পরিবহনে সহায়তা করে। অন্যদিকে শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান তৈরি, ব্যবসার বিকাশ এবং অভিন্ন সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করে। তাই শিক্ষাকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সেতুবন্ধ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে শিক্ষার সুযোগকে শক্তিশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা। অন্যদিকে চীনের জন্য সুযোগ রয়েছে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার, যারা দুই দেশের সমাজ ও অর্থনীতি সম্পর্কে জানবে এবং পারস্পরিক সহযোগিতায় ভূমিকা রাখতে পারবে।
বিআরআই সহযোগিতার এক দশক পূর্তিতে তাই শুধু সম্পন্ন প্রকল্পের হিসাব নয়, বরং শিক্ষা, উদ্ভাবন ও সহযোগিতায় সক্ষম একটি প্রজন্ম গড়ে তোলাকেও আগামী দিনের সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন লেখক।
সূত্র: চায়না ডেইলি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


