বাঁশশিল্পে ৪০ হাজার নারীর জীবন-জীবিকা

বাঁশশিল্পে ৪০ হাজার নারীর জীবন-জীবিকা

সুপ্রাচীনকাল থেকেই এ দেশে নারীদের তৈজসপত্র বা হস্তশিল্প তৈরিতে সুনাম রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের নারীদের নিজস্ব সংস্কৃতির একটি শিল্প হলো বাঁশশিল্প। গ্রামীণ নারীদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ছাড়াও ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর জীবনাচরণ এবং অনুভূতির প্রতীক এই শিল্প। নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত নারী কারিগররা বাঁশশিল্পের শৌখিন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের জীবনে আজও শৌখিনতার ছোঁয়া লাগেনি।

ব্যাসকাঠির বাঁশশিল্প : সুকলা মজুমদারের কাছে তাদের বৈচিত্র্যময় জীবনের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কম দামের এক টুকরো কাপড় আর দুমুঠো খাবারেই গুজরান নিত্যদিনের সম্বল।’ প্লাস্টিক পণ্যসামগ্রীই ওদের সুখের জায়গা দখল করে নিয়েছে। কথোপকথনের একপর্যায়ে অশ্রুসিক্ত জল আর দীর্ঘশ্বাস যেন বলে দেয়, ‘ওদের কাছে বেঁচে থাকা মানেই ভালো থাকা।’ আধুনিকায়নে এই হস্তশিল্প অনেকটা ম্লান হয়ে যাওয়ায় বাঁশশিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কমে গেছে। স্বরূপকাঠি বিসিক শিল্পনগরীর সুবিধাবঞ্চিত দুটি বাঁশশিল্প বন্ধ হয়ে গেছে আরো ৯ বছর আগে। বিংশ শতাব্দীর শেষদিকেও নেছারাবাদ উপজেলায় (স্বরূপকাঠি) ১৩৭টি গ্রামে ৪৬টি বাঁশশিল্প ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে ২৬টি বিলুপ্তি হয়ে গেলেও ২০টি শিল্প এখনো টিকে আছে।

বিজ্ঞাপন

সারেংকাঠির বাঁশশিল্প : মালিক শিলা হালাদার বলেন, ‘বাপ-দাদার এ পেশায় এখনো আছি আর কয়দিন টিকে থাকতে পারব, তা জানি না।’ বাঁশের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্রের বাজার দখল, বাঁশের অপ্রতুলতা, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ও পরিকল্পিত উদ্যোগ না থাকায় বিলুপ্ত হতে চলছে নেছারাবাদের গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প। প্রায় পাঁচ যুগ আগেও গৃহস্থালি ব্যবহারে বাঁশের তৈরি বহুমাত্রিক পণ্যের ব্যবহার ছিল পল্লির ঘরে ঘরে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অর্ধশত বছর আগেও নেছারাবাদ উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার বাঁশশিল্পী নারী উদ্যোক্তা বাণিজ্যের কথা চিন্তা করে পৈতৃক পেশায় জড়িত থেকে ৩০-৪০ প্রকারের শৌখিন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আর প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে বাঁশ হস্তশিল্প বিলুপ্ত হতে চলছে। গ্রামীণ নারীদের উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান ও সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি (গ্রামউকসক) সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের যে কয়টি প্রাকৃতিক উপাদান লোকজীবনের সঙ্গে মিশে আছে, তার মধ্যে গ্রামীণ নারীদের বাঁশশিল্প একটি বড় সংস্কৃতি।

বাঁশশিল্পে-৪০-হাজার-নারীর-জীবন-জীবিকা-২

নেছারাবাদ উপজেলায় পৈতৃক সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে করফা, সারেংকাঠি, গয়েসকাঠি, ভরতকাঠি, কাটাপিটানিয়া, জিরবাড়ি, খেজুরবাড়ি, লেবুবাড়ি, চিলতলা, রাজাবাড়ি, দেবদাসকাঠি, ব্যসকাঠিসহ ২০টি গ্রামে পাঁচ শতাধিক নারীপ্রধান পরিবারের প্রায় ৭ হাজার নারীশ্রমিক বাঁশশিল্পকে উপার্জনের প্রধান উৎস হিসেবে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছেন। এসব গ্রামের প্রত্যেকটি বসতবাড়ি এখনো যেন একেকটি বাঁশশিল্প প্রতিষ্ঠান। বিকাল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সারিবদ্ধভাবে বসে বুনছেন বাঁশের পণ্য এবং হাজারো নারী স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। নারীপ্রধান পরিবারগুলোর ছেলেমেয়েরাও পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে মাকে সহযোগিতা করছে এ কাজে।

চিলতলা গ্রামের বৈরাগী সেতু শিকদার বলেন, ‘১৩ বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। চারটি ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার। বাঁশের চটি, বেতি বানিয়ে ওদের তিনজনের লেখাপড়া ও সংসার চালাতে হয়।’ জিরবাড়ির বাঁশশিল্পের কারিগর তালাকপ্রাপ্ত সবিতা ডালী বলেন, ‘স্বামীর সংসার অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। দুই সন্তান নিয়ে এ মাছ ধরা খলই তৈরি করে যা পাই, তা দিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছি।’

ভরতকাঠির কবিতা হালদার বলেন, ‘বিকাল ৩টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বাঁশ দিয়ে আউড়া তৈরি করি। স্বামী বিভিন্ন এলাকার বাঁশশিল্পের পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বিক্রি করে যে আয় করতেন, তা দিয়ে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালোই চলত। কিন্তু বর্তমানে প্লাস্টিক পণ্য মোগো ভাত কেড়ে নিয়েছে। তার পরও পৈতৃক পেশা টিকিয়ে আছি।’

বাঁশ দিয়ে কীভাবে গৃহস্থালি ব্যবহারের পণ্য তৈরি করা হয়, তা জানতে চাইলে গয়েসকাঠির বাঁশশিল্পের মালিক পুষ্প রানি বলেন, ‘প্রথমে পণ্য অনুযায়ী বাঁশ তিন দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। এরপর বাঁশ চিরে ফানা, কণসি, বাঁশের চটি, বেতি, আউড়া, মাড়াই ও পণ্য তৈরির মাপে চারপাশ বাঁধাই করার জন্য বাঁশের সুতি প্রস্তুত করে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা হয়।’ এসব কাঁচা উপাদান দিয়ে পল্লির নারীদের নিপুণ হাতের শৈল্পিক ছোঁয়ায় ঝুড়ি, চাটাই, ডালি, হাতপাখা, কুলা, চালুন, ঝাড়ু, খুঁচি, ভাত-তরকারি রাখার ঝাঁপা, মাছের খাঁচা, মাছ ধরার খলই, পশুর হাত থেকে গাছ রক্ষার খাঁচা, মুরগির বাচ্চা রাখার খলই, পুরা, খাড়াই, ঝাড়ঝড়ি, ঢাকনা, বইপত্র রাখার র‌্যাক, ধান-চাল রাখার মোড়াসহ প্রায় ২০-২২ ধরনের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতীক তৈরি করা হয়।

কয়েকটি এলাকা সরেজমিন ঘুরে বাঁশের অনেক শৌখিন পণ্য তৈরির দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় কথা হয় দেবদাসকাঠির ৭০ বছর বয়সি বর্ষীয়ান বাঁশশিল্পের কারিগর হরিমন বিবির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২২ বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। ছেলেমেয়েরাও খোঁজখবর নেয় না। বৃদ্ধ বয়সে বাঁশের আশ বানিয়ে যা পাই, তা দিয়ে কোনো রকমে আছি। রোগবালাইয়ের শেষ নেই। ওষুধ কিনতে জান ফুরিয়ে যায়। আগের মতো এখন আর কাজ করতে পারি না। কাজ বন্ধ হয়ে গেলে কী খাইয়া যে বাচুম, হেয়া মুই জানি না রে বাজান!’

সচেতন মহল মনে করে, এ শিল্পটি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের অন্তর্ভুক্ত হলেও সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো সংস্থাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার ভূমিকায় এগিয়ে আসছে না। এ শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে জরুরিভাবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা, পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

এ ব্যাপারে স্বরূপকাঠির ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প (বিসিক) ম্যানেজার মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, বাঁশশিল্পকে ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তকরণের বাস্তবায়নে মাঝারি শিল্প খাতের দ্রুত বিকাশ ও উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারিশিল্পে নারী উদ্যোক্তারা যাতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, সেজন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন