যারা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগী, যাদের কিডনি বিকল হয়ে পঞ্চম ধাপে আছেন, যাদের নিয়মিত ডায়ালিসিস করতে হচ্ছে, যাদের মূত্রতন্ত্রের প্রদাহের চিকিৎসা চলছে, আকস্মিক কিডনি বিকল রোগীদের মধ্যে যারা কিডনির কোনো জরুরি অপারেশন করাতে হচ্ছে, তাদের জন্য রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগীদের যদি রক্তের উপাদানে কোনো জটিলতা দেখা দেয়, যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত, তাদের এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে রোজা রাখতে হবে।
কোন ধরনের খাবার খাবেন?
সাধারণত ক্রিয়েটিনিন বেশি থাকলে কিডনি রোগীদের ডাল ও ডালের তৈরি খাবার খেতে নিষেধ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পেঁয়াজু, বেসনের তৈরি বেগুনি, হালিম ইত্যাদি। সুতরাং কিডনি রোগীদের এসব খাবার খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। এর বদলে চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি খাবার খেতে পারেন। সবজির পাকোড়া ময়দা দিয়ে বানিয়ে খেতে পারেন। আলুর চপ ডিমের সাদা অংশ দিয়ে ভেজে খেতে পারেন। এ ছাড়া বাইরের কৃত্রিম রঙ দেওয়া খাবার, টেস্টিং সল্ট দেওয়া খাবার না খাওয়াই ভালো। কিডনি রোগীদের শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রার ওপর নির্ভর করে তারা কোন ধরনের ফল খাবেন, নাকি একদমই খাবেন না। তবে আপেল, বিচি ছাড়া পেয়ারা, নাশপাতি, পাকা পেঁপে, আনারস খেতে পারবেন পরিমাণমতো। এ ছাড়া এসব খাবার দিয়ে জুস বা ডেজার্ট করেও খেতে পারবেন। ভাত, রুটি, মাছ, মুরগির মাংস, দুধ ইত্যাদি কিডনির অবস্থার ওপর নির্ভর করে পরিমাণমতো খেতে পারবেন। প্রোটিনজাতীয় খাবার বিশেষ করে গরু-খাসির মাংস কম খেতে হবে। ১৫ দিন পর পর এক দিন খাওয়া ভালো। তবে মুরগি, মাছ রোজ পরিমাণমতো খেতে পারবেন।
সে ক্ষেত্রে মাছ খেলে মাংস বা ডিম খাবেন না সেই বেলা। যাদের রক্তে পটাশিয়াম বেশি, তারা শাকসবজি পটাশিয়ামমুক্ত করে পানিতে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে খাবেন । ফল সীমিত পরিমাণ খাবেন। আপনার ডাক্তারের পরামর্শে রক্তের উপাদান মাঝে মাঝে পরীক্ষা করিয়ে নেবেন। সাহরির সময় ভাত-রুটি, মাছ-মাংস, ডিম, দুধ পরিমিত খাবেন। ইফতারের সময় খাবেন খেজুর, চিড়া, দই, ডিমের পুডিং, সুজি, সেমাই, পায়েস ও সাবুদানা ভালো হবে। সেই সঙ্গে আলগা লবণ ও লবণজাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে।
খাদ্য তালিকা
শাক : লালশাক, ডাঁটাশাক, কলমি শাক, মিষ্টি কুমড়া শাক, লাউশাক, সরিষা শাক ও কচুশাক খেতে পারবেন।
সবজি : ডাঁটা, পটোল, করলা, ঝিঙা, কাঁকরোল, লাউ, শসা, বেগুন, চাল কুমড়া, বিচি ছাড়া শিম, ধুন্দুল, গাজর, চিচিঙ্গা ও আলু পরিমাণে কম খেতে পারবে।
ফল : আপেল, পাকা পেঁপে, পাকা পেয়ারা, আনারস, নাশপাতি, জামরুল, পাকা কাঁঠাল, কাঁচা আম ও পাকা বেল।
অন্যান্য : চাল, আটা, ময়দা, মুড়ি, চিড়া, মুগ ডাল (অল্প পরিমাণ), সেমাই, সুজি, বার্লি, কর্নফ্লেক্স, ভুট্টা, কর্নফ্লাওয়ার ইত্যাদি।
মনে রাখতে হবে, এখন প্রচণ্ড গরমের সময়। খোলা খাবার, রাস্তার পাশে বিভিন্ন রঙবেরঙের শরবত সহজেই জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। এগুলো খেয়ে ডায়রিয়া, বমিতে আক্রান্ত হয়ে অনেক রোগীর আকস্মিক কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। এ জন্য এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। বাড়ির সবার সঙ্গে ইফতার করলেও কিডনি রোগীর ডায়েট প্ল্যানটা হবে আলাদা, সেই অনুযায়ী সঠিক খাদ্য পরিমাণমতো খেলেই রোজা রাখতে কোনো অসুবিধা হবে না। সকালের ওষুধ সাহরিতে এবং রাতের ওষুধ ইফতারে খাওয়া যাবে। সকালে বা সাহরিতে ওষুধ কম রাখা ভালো; যদি সম্ভব হয়। পরিশেষে বলতে চাই, কিডনি রোগ প্রায়ই অলক্ষিত থাকে, ৮ থেকে ১০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্করা কোনো না কোনো ধরনের কিডনি ক্ষতির শিকার হন। অনেক মানুষই জানেন না যে তাদের কিডনি রোগ আছে, যতক্ষণ না গুরুতর জটিলতা দেখা দেয়। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ কিডনি রোগ সম্পর্কিত রোগে মৃত্যুবরণ করেন। প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয় একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আনতে পারে। কারণ সাধারণ রক্ত এবং প্রস্রাব পরীক্ষা সমস্যাগুলো গুরুতর হওয়ার আগেই শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
লেখক: চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান
জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

