আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ছোট মেঘ বড় মেঘ

জসীম আল ফাহিম

ছোট মেঘ বড় মেঘ

শরতের আকাশ। আকাশে ভাসমান অসংখ্য মেঘ। ওসব মেঘের হরেক রঙ, হরেক রূপ। কোথাও ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘের বড় বড় চাঁই। কোথাও বা মাঝারি আকারের চাঁই। কোথাও আবার ছোট ছোট মেঘ। এই ছোট একেকটা খণ্ডের ওজন কত হবে জানো? কম করে হলেও কয়েক হাজার টন। কয়েক শ টন। ওজন যাই হোক, সেটি আসল ব্যাপার না। ব্যাপার হলো দুই খণ্ড মেঘ কী করে যেন পরস্পরের বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। এদের একখণ্ড বড় মেঘ। আরেক খণ্ড ছোট।

ছোট মেঘখণ্ডটি বড় মেঘখণ্ডকে উদ্দেশ্য করে বলল, হ্যাঁ রে ভাই। সবাই দেখছি শুধু দৌড়াচ্ছে। শুধুই যাচ্ছে। আমরাও যাচ্ছি। তা যাচ্ছি কোথায়?

বিজ্ঞাপন

ছোট মেঘখণ্ডের কথা শুনে বড় মেঘখণ্ড বলল, তার আমি কী জানি।

তখন ছোট মেঘখণ্ড বলল, তুমি জানো না বলছো! তাহলে যাচ্ছো কেন? না গেলেই তো পারো।

জবাবে বড় মেঘখণ্ড বলল, না। তা অবশ্য পারি না।

ছোট মেঘখণ্ড বলল, কেন পারো না?

বড় মেঘখণ্ড বলল, দেখছো না সবাই কেমন যাচ্ছে। কাজেই আমাদেরও যেতে হবে। যাওয়াই নিয়ম। আমি তো নিয়ম ভাঙতে পারব না। তাই যাচ্ছি।

বড় মেঘখণ্ডের কথা শুনে ছোট মেঘখণ্ড বলল, এটা কোনো কথা হলো নাকি! কেউ যাচ্ছে বলে আমরাও যাব, এটা আসলে জ্ঞানীর কাজ নয়।

ছোট মেঘখণ্ডের কথা শুনে বড় মেঘখণ্ড বিরক্তিভরা চোখে ওর পানে কিছু সময় তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, নিজেকে খুব জ্ঞানী মনে করো নাকি তুমি?

জবাবে ছোট মেঘখণ্ড বলল, না। তা অবশ্য মনে করি না। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে একবার সবার ভেবে দেখা উচিত নয় কী?

বড় মেঘখণ্ড, তুমিই গভীরভাবে একবার ভেবে দেখো, সবার সঙ্গে না-গিয়ে থাকা যায় কি না।

বড় মেঘখণ্ডের এরূপ কথায় ছোট মেঘখণ্ড যেন কিছু একটা খোঁচা অনুভব করল। পরে কোনো কথা না-বলে একদম চুপচাপ হয়ে গেল সে। কিন্তু এভাবে চুপচাপ হয়ে কী কোথাও যাওয়া যায়? যায় না। বিরক্তি এসে ভিড় করে। একগুঁয়েমি ভাব এসে যায় মনে। তাই সে আবার সরব হয়ে উঠল। বলল, আছো বড় মেঘখণ্ড। আমরা কতক্ষণ এভাবে আকাশে ঘুরে বেড়াব? আমার মধ্যে যে ক্লান্তি এসে ভর করেছে। আর কতক্ষণ আমরা এভাবে ছোটাছুটি করব?

বড় মেঘখণ্ড বলল, যতক্ষণ না আমরা আকাশে ঘুরে ঘুরে কালো হয়ে যাই, ততক্ষণ।

বড় মেঘখণ্ডের কথা শুনে ছোট মেঘখণ্ড ভারী অবাক হলো। অবাক কণ্ঠে সে বলল, আচ্ছা আকাশে ঘুরে ঘুরে কালো হয়ে গেলে আমাদের কী হবে?

বড় মেঘ বলল, কালো হওয়া মানে আমাদের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা হওয়া। আর কার্বন ডাই-অক্সাইড জমা হলে আমরা ভারী হয়ে যাব।

বড় মেঘখণ্ডের কথা শুনে ছোট মেঘখণ্ড বলল, ভারী হলে কী হবে?

বড় মেঘখণ্ড বলল, ভারী হলে তো আমরা আর আকাশে ভেসে বেড়াতে পারব না। আর ভেসে বেড়াতে না পারলে আমরা অচিরেই ঝরে যাব।

ছোট মেঘখণ্ড বলল, ঝরে যাব মানে কী?

জবাবে বড় মেঘখণ্ড বলল, ঝরে যাওয়া মানে হলো বৃষ্টি হওয়া। আমরা ভারী হয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ব।

ওর কথা শুনে মনে হলো ছোট মেঘখণ্ড কিছুটা ভয় পেয়ে গেছে। সেটা ঝরে যাওয়ার ভয়। বৃষ্টি হওয়ার ভয়। পরে বলল, আমি ঝরে যেতে চাই না। আমি বৃষ্টি হতেও চাই না।

ছোট মেঘখণ্ডের কথা শুনে বড় মেঘখণ্ড বলল, তাহলে তুমি কী হতে চাও? তোমার স্বপ্ন কী?

ছোট মেঘখণ্ড বলল, আমি চাই অনন্তকাল ধরে আকাশের কোলে ভেসে বেড়াই। ভেসে ভেসে আকাশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে গমন করি। ইচ্ছেমতো আনন্দ করি। মন খুলে মজা করি।

বড় মেঘখণ্ড বলল, এটি তো কখনো সম্ভব নয়। কারণ ভারী হয়ে গেলে ঝরতে তোমাকে হবেই। না ঝরে কোনো উপায় নেই। ঝরে পড়াই আমাদের নিয়তি। তুমি নিয়তিকে অগ্রাহ্য করতে পারো না।

ওর কথা শোনে মনে হলো ছোট মেঘখণ্ড ভয়ে একেবারে সিঁটিয়ে পড়েছে। ভয়ার্ত কণ্ঠে সে বলল, এখন আমার কী হবে তাহলে? আমি যে ভারী হয়ে যাচ্ছি!

ওর কথা শোনে বড় মেঘখণ্ড মিটিমিটি হাসল। ওর এরূপ হাসি দেখে ছোট মেঘখণ্ড ভয়ে একেবারে কান্নাই জুড়ে দিল। সেই বিরাট হাউমাউ কান্না। ওর এরূপ কান্না দেখে বড় মেঘখণ্ড ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, কাঁদো। কাঁদো। মনপ্রাণ উজাড় করে কাঁদো। এই কান্নাই আমাদের জীবনের ব্রত। কান্নাই আমাদের জীবনের লক্ষ্য।

পরক্ষণে ছোট মেঘখণ্ডটা কাঁদতে কাঁদতে বৃষ্টি হয়ে ঝরতে শুরু করল। তার সঙ্গে বড় মেঘখণ্ডটাও। তার সঙ্গে আশপাশের অন্য মেঘখণ্ডগুলোও। মেঘেদের এভাবে কান্না করার ফলেই আসলে পৃথিবীতে বৃষ্টি হয়। যে বৃষ্টিতে আমরা ভিজে আনন্দিত হই। বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে সবুজ হয় প্রকৃতি। মাটি হয় উর্বর। গাছে গাছে ফুল ফুটে। বৃষ্টি ভেজা হয়ে আবার কোনো পাখপাখালি গানে বিভোর হয়।

ছোট মেঘখণ্ড এবং বড় মেঘখণ্ড বৃষ্টি হয়ে যেখানে এসে ঝরে পড়ল, সেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আনন্দে বৃষ্টিভেজা হচ্ছিল। খিলখিল করে ওরা আপন মনে হাসছিল। কিছুতেই যেন তাদের সেই হাসি আটকে রাখতে পারছিল না। ওদের এত হাসি দেখে ছোট মেগঘণ্ড এবং বড় মেঘখণ্ডও না হেসে পারল না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন