আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

শীতে গলার স্বরে সমস্যা

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

শীতে গলার স্বরে সমস্যা

শীতকাল এলেই ঠান্ডা বাতাস, শুষ্ক আবহাওয়া ও সর্দি-কাশির সঙ্গে বাড়ে গলার স্বর বসে যাওয়ার প্রবণতা। অনেকেই এ সময় খেয়াল করেন, স্বর খসখসে হয়ে যাচ্ছে, আগের মতো পরিষ্কার বা জোরে কথা বলা যাচ্ছে না, কখনো হঠাৎ করেই স্বর কমে আসছে। শিশু, পুরুষ ও নারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার ধরন একরকম নয়, তবে এর প্রভাব সবার জীবনেই কমবেশি পড়ে। বিশেষ করে যারা শিক্ষক, ইমাম, বক্তা, কণ্ঠশিল্পী কিংবা পেশাগত কারণে দীর্ঘ সময় কথা বলেন, তাদের জন্য শীতকালীন স্বর সমস্যা দৈনন্দিন কাজের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। গলার স্বর বসে যাওয়া শুধু সাময়িক অস্বস্তি নয়, অবহেলা করলে এটি ভোকাল কর্ডের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা কিংবা স্থায়ী স্বর হ্রাসের কারণও হতে পারে।

গলার স্বর বসে যাওয়ার কারণ

বিজ্ঞাপন

শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়। এর ফলে গলার ভেতরের কণ্ঠনালি ও ভোকাল কর্ড স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারায়। শুষ্ক ভোকাল কর্ড ঠিকভাবে কম্পন করতে না পারায় স্বর খসখসে, ভারী বা দুর্বল শোনায়। শিশুদের ভোকাল কর্ড কোমল হওয়ায় তারা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে স্বরের গভীরতা কমে যেতে পারে আর নারীদের ক্ষেত্রে স্বর পাতলা বা ভাঙা ভাঙা শোনাতে পারে।

ঠান্ডাজনিত সংক্রমণ

শীতকাল সর্দি, কাশি ও ভাইরাসজনিত সংক্রমণের মৌসুম। এসব সংক্রমণে গলার ভেতরে ফোলা ভাব তৈরি হয়, যা স্বরের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় তাদের স্বর দ্রুত পরিবর্তিত হয়। নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনজনিত সংবেদনশীলতার কারণে এ সমস্যা আরো প্রকট হতে পারে।

অতিরিক্ত কথা বলা

ঠান্ডা আবহাওয়ায় গলার পেশি স্বাভাবিক অবস্থার তুলনায় শক্ত হয়ে যায়। এ অবস্থায় দীর্ঘ সময় কথা বলা, জোরে কথা বলা বা চিৎকার করলে ভোকাল কর্ডে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। শিশুদের খেলাধুলা ও চিৎকার, পুরুষদের দীর্ঘ বক্তৃতা বা গান এবং নারীদের টানা কথা বলা—সবই শীতকালে স্বর সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

পানিশূন্যতা

শীতকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হওয়ায় অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করেন। ফলে শরীরের সঙ্গে সঙ্গে ভোকাল কর্ডও শুষ্ক হয়ে পড়ে। শিশুদের পানিপানের অভ্যাস কম থাকায় তারা দ্রুত স্বর সমস্যায় আক্রান্ত হয়। বড়দের ক্ষেত্রে এর ফলে স্বর ঝাঁকুনি ও ক্লান্তি দেখা দেয়।

ধুলো ও অ্যালার্জি

শীতকালে বাতাসে ধুলো, শুকনো পাতা ও নানা ধরনের অ্যালার্জেন বেড়ে যায়। শিশুদের শ্বাসনালি সংবেদনশীল হওয়ায় অ্যালার্জির প্রভাবে তাদের স্বর খসখসে হয়ে যায়। নারীদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জি স্বরে ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে, আর পুরুষদের ক্ষেত্রে গভীর স্বরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়।

যে লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়

* স্বর খসখসে বা ভারী শোনানো

* হঠাৎ স্বর কমে যাওয়া

* গলায় শুষ্কতা, জ্বালা বা অস্বস্তি

* দীর্ঘ সময় কথা বলার পর স্বর ক্লান্ত হয়ে যাওয়া

* শিশুদের ক্ষেত্রে অল্প সময় চিৎকারেই স্বর বসে যাওয়া

* কফ জমে স্বর ভাঙা বা বাঁকা শোনানো

জটিলতা

শীতকালীন স্বর হ্রাস যদি দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয় বা বারবার ফিরে আসে, তাহলে তা ভোকাল কর্ডের পেশি দুর্বলতা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ফোলা ভাবের ইঙ্গিত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি পড়াশোনায় মনোযোগ কমিয়ে দিতে পারে। পুরুষদের গভীর স্বরে স্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে স্বরের টোন বদলে যাওয়ায় সামাজিক ও পেশাগত জীবনে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

প্রতিরোধ ও যত্নে করণীয়

নিয়মিত কুসুম গরম পানি পান গলার শুষ্কতা কমায়। ঘরের বাতাস বেশি শুষ্ক হলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার উপকারী। অপ্রয়োজনীয় কথা বলা, জোরে কথা বলা ও চিৎকার এড়িয়ে চলুন। শিশুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি।

হালকা ভোকাল ব্যায়াম

গুনগুন করা, হালকা স্বর অনুশীলন বা গলার স্ট্রেচ ভোকাল কর্ডকে সক্রিয় ও নমনীয় রাখে। পর্যাপ্ত পানি ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। শিশুদের দিনে ছয় থেকে আট গ্লাস এবং বড়দের ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত। ভিটামিন সি ও জিংক-সমৃদ্ধ খাবার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। গলা উষ্ণ রাখার চেষ্টা করতে হবে। ঠান্ডা বাতাসে বের হলে স্কার্ফ বা গলার কাপড় ব্যবহার করুন। সরাসরি ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। ঘরে ধুলো ও অ্যালার্জেন কমাতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।

পরিশেষে বলতে চাই, শীতকালীন গলার স্বর সমস্যা সাধারণ হলেও একে অবহেলা করা ঠিক নয়। শিশু, পুরুষ ও নারীদের ক্ষেত্রে এর প্রকাশ ভিন্ন হলেও সচেতন জীবনযাপন, পর্যাপ্ত পানি পান, গলা উষ্ণ রাখা ও ভোকাল বিশ্রাম—এ কয়েকটি অভ্যাসই শীতকালে স্বর সুস্থ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান

জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি

drmazed96@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন