আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

হোয়াটসঅ্যাপের জন্মকথা

জুবাইর আল হাদী

হোয়াটসঅ্যাপের জন্মকথা

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়ে আমরা যে যোগাযোগব্যবস্থাকে প্রায় শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো স্বাভাবিক মনে করি, তার পেছনে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। আজকের লেখাটি বহুল ব্যবহৃত মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ নিয়ে। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ইয়াহুর দুই প্রাক্তন কর্মী—ব্রায়ান অ্যাক্টন ও জান কৌম নতুন কিছু করার স্বপ্নে বিভোর। জান কৌম সদ্য একটি আইফোন কিনেছেন। অ্যাপ স্টোর ঘাঁটতে ঘাঁটতে তার মাথায় আসে একটি সাধারণ কিন্তু অভিনব ধারণা। যেখানে মানুষ নিজের স্ট্যাটাস জানাতে পারবে। প্রথমদিকে বিষয়টি ছিল নিছক স্ট্যাটাস আপডেটের চিন্তা, কোনো মেসেজিং অ্যাপ নয়।

এই ভাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা হতো পশ্চিম সান হোসেতে কৌমের রুশ বন্ধু অ্যালেক্স ফিশম্যানের বাড়িতে। দ্রুতই বোঝা গেল, ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে একজন দক্ষ আইফোন ডেভেলপার দরকার। ফিশম্যান RentACoder.com ঘেঁটে খুঁজে পান রাশিয়ান প্রোগ্রামার ইগর সোলোমেনিকভকে। তার হাত ধরেই শুরু হয় হোয়াটসঅ্যাপের প্রযুক্তিগত যাত্রা। অ্যাপটির নামকরণেও ছিল এক ধরনের কৌতুক—‘What’s Up’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নাম রাখা হলো ‘WhatsApp’। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত হলো WhatsApp Inc. কিন্তু পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। শুরুর দিকের ভার্সনগুলো ঘন ঘন ক্র্যাশ করত। হতাশ হয়ে জান কৌম প্রায় হাল ছেড়েই দিতে চেয়েছিলেন। তখন ব্রায়ান অ্যাক্টন তাকে বলেছিলেন, ‘আর কয়েক মাস অপেক্ষা করো।’

বিজ্ঞাপন

২০০৯ সালের জুনে অ্যাপল চালু করে পুশ নোটিফিকেশন। এই প্রযুক্তিই হোয়াটসঅ্যাপকে নতুন প্রাণ দেয়। কৌম দ্রুত অ্যাপটি আপডেট করেন—এখন কেউ স্ট্যাটাস বদলালেই তা নেটওয়ার্কের সবাই জানতে পারে।

আগস্ট-২০০৯-এ আসে WhatsApp 2.0—এবার পুরোপুরি মেসেজিং সুবিধাসহ। ব্যবহারকারী সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আড়াই লাখে। অক্টোবরে ব্রায়ান অ্যাক্টন আনুষ্ঠানিকভাবে সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে যোগ দেন এবং ইয়াহুর সাবেক সহকর্মীদের কাছ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের তহবিল জোগাড় করেন। এরপর একে একে আইফোন, ব্ল্যাকবেরি, সিম্বিয়ান ও অ্যান্ড্রয়েড—সব প্ল্যাটফর্মেই ছড়িয়ে পড়ে হোয়াটসঅ্যাপ। শুরুতে বিনামূল্যের সেবা হলেও যাচাইকরণ এসএমএসের খরচ সামলাতে একসময় নামমাত্র ফি চালু হয়। ২০১১ সালের মধ্যেই হোয়াটসঅ্যাপ মার্কিন অ্যাপ স্টোরের শীর্ষ ২০ অ্যাপের একটিতে পরিণত হয়। সাফল্যের এই গতি বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ে। ২০১১ সালে সেকোইয়া ক্যাপিটাল প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। ২০১৩ নাগাদ হোয়াটসঅ্যাপের সক্রিয় ব্যবহারকারী সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ২০০ মিলিয়ন। এরপর আসে ইতিহাসের এক স্মরণীয় মুহূর্ত। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে ফেসবুক (বর্তমান মেটা) ঘোষণা দেয়—১৯ বিলিয়ন ডলারে তারা হোয়াটসঅ্যাপ কিনে নিচ্ছে। প্রযুক্তি বিশ্বে আলোড়ন ওঠে। কেউ একে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ বলে দেখলেন, কেউ আবার গোপনীয়তা নিয়ে শঙ্কিত হলেন। অধিগ্রহণের পরপরই টেলিগ্রামসহ অন্যান্য মেসেজিং অ্যাপে ব্যবহারকারীর ঢল নামে। ফেসবুকের অধীনে থেকেও হোয়াটসঅ্যাপ ধীরে ধীরে যোগ করতে থাকে নতুন ফিচার—ভয়েস কল, ভিডিও কল, স্ট্যাটাস, এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন, ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট। ২০১৬ সালে বার্ষিক ১ ডলারের সাবস্ক্রিপশন ফি তুলে নেওয়া হয়। জান কৌম ঘোষণা দেন—কোনো বিজ্ঞাপন নয়, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাই অগ্রাধিকার। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নানা বিতর্কও এসেছে। যেমন : ডেটা শেয়ারিং, গোপনীয়তা নীতি, ইউরোপীয় কমিশনের জরিমানা। ২০১৭ সালে ব্রায়ান অ্যাক্টন কোম্পানি ছেড়ে সিগন্যাল ফাউন্ডেশন গড়ে তোলেন। ২০১৮ সালে বিদায় নেন জান কৌমও। তবু হোয়াটসঅ্যাপ থেমে থাকেনি। ২০২০ সালের পর করোনাভাইরাস মহামারিতে হোয়াটসঅ্যাপ হয়ে ওঠে তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ডার্ক মোড, মাল্টি-ডিভাইস সাপোর্ট, কমিউনিটি ফিচার, বড় ফাইল শেয়ার—নিত্যনতুন আপডেটে অ্যাপটি আরো শক্তিশালী হয়। ২০২২ সালে গ্রুপের আকার বেড়ে দাঁড়ায় ৫১২ জনে, ফাইল পাঠানোর সীমা হয় ২ গিগাবাইট। একসময়ের ছোট্ট স্ট্যাটাস অ্যাপ আজ এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...