তুবার পাহাড়ে ওঠার স্বপ্ন অনেক দিনের। যখন শুনেছে সাজেক যাবে, তখন থেকে রাতের ঘুম হারিয়ে গেল। সাজেক গিয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা, মেঘের কাছাকাছি থাকা আর হাত বাড়িয়ে শুভ্র মেঘমালার আকাশটাকে ছুঁয়ে দিতে পারলেই যেন মহাখুশি ও। রাতের বেলা মাকে জড়িয়ে ধরে শোয় তুবা।
‘মা, আমরা কি আকাশটাকে ছুঁয়ে দেখতে পারব? মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়াতে পারব?’
মা হাসেন—‘পাগলি মা আমার। সাজেক গেলে তুমি খুব কাছে থেকে মেঘের ভেলা দেখতে পারবে। আকাশটাকে খুব কাছে মনে হবে। যেখানেই তাকাবে সেদিকেই পাহাড় আর পাহাড়। সব পাহাড়ে উঠতে গেলে মাস পেরিয়ে যাবে! তবু দেখা শেষ হবে না! বুঝলে, মা।’
‘ওখানে এত পাহাড় কেন, মা? আমাদের এখানে নেই কেন? আমাদের বাসার সামনে একটা পাহাড় থাকলে ভালো হতো; তাই না, মা?’
‘হুম! তোমার পাহাড় দেখার খুব শখ! দুদিন পর তোমার বাবা আমাদের সাজেক নিয়ে যাবেন। এখন ঘুমাও।’
ঘুম কি আর আসে? সাজেক যাওয়ার পর থেকেই তুবার ঘুম হারাম হয়ে যায়। সাজেক যাওয়ার স্বপ্ন দেখে কখন যে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে—টের পায়নি।
এসি বাস দাঁড়িয়ে কাউন্টারের সামনে। বাবা লাগেজ আর মা তুবার হাত ধরে এগিয়ে গেলেন বাসটির দিকে। রাত ঠিক ১০টায় বাসটি ছুটে যাবে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার উদ্দেশে।
বাস স্টার্ট দিয়েই ছুটে চলল ঢাকা শহরকে পেছনে ফেলে। মা আড়চোখে তাকিয়ে দেখেন তুবা ঘুমিয়ে পড়েছে।
ঘণ্টাখানেক পরেই তুবা চোখ মেলে দেখে মা-বাবা দুজনেই ঝিমুচ্ছেন। তুবাও ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম নেই গাড়িচালকের। সুপারভাইজার আর হেলপারের। কতক্ষণে নিরাপদে গন্তব্যস্থলে পৌঁছাবে, সেই লক্ষ্যেই মনোযোগসহ গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।
গভীর রাত। কুমিল্লার ফেনী দিয়ে ঢুকে পড়েছে পাহাড়ি এলাকায়। দুপাশে পাহাড় আর পাহাড়! আচমকা গাড়ি থেমে গেল। সেনাবাহিনী গাড়ি বন্ধ রাখতে ইশারা দিয়েছে। রিমোট এরিয়াটুকু বারবার টহল দিচ্ছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাহসী সেনারা। সঙ্গে বিজিবির টহলও অব্যাহত আছে।
সেনাবাহিনী ইশারা দিতেই চালক আবারও স্টার্ট দিয়ে ছুটে চলল খাগড়াছড়ির দিকে। পাহাড়, বন, গাছপালা ও উঁচুনিচু টিলার ওপর গড়ে ওঠা বাড়িগুলো পেছনে ফেলে যখন খাগড়াছড়ি থামল, তখন ঘড়ির কাঁটা ৫টা ছুঁইছুঁই। চালককে ধন্যবাদ জানিয়ে একে একে সবাই নেমে পড়ল বাস থেকে।
পুরোপুরি ফর্সা হয়নি আকাশ। সাফিন সাহেবকে দেখে একটা বড়সড় জিপগাড়ি ছুটে এলো। আগে থেকেই সব ঠিক করে চুক্তিতে জিপগাড়িটি নিয়ে নিয়েছেন বাবা।
জিপ বাবা, মা আর তুবাকে নিয়ে ছুটে চলল দীঘিনালা হার্টিজম রেস্ট হাউসের দিকে।
তুবার দুচোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! দুপাশে গাছপালা, উঁচুনিচু পাহাড় ও টিলা দেখে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে।
ঘণ্টা খানেকের মধ্যে হার্টিজমের ভেতর প্রবেশ করতেই এগিয়ে এলেন একজন। অভ্যর্থনা জানালেন।
বাবা চালককে এক ঘণ্টা পরে আসতে বলে ওপরে উঠে এলেন। একে একে সবাই গোসল করে ফ্রেশ হলো। তারপর ড্রেস পরিবর্তন করলেন সবাই। তুবাকে সুন্দর একটা ফ্রক পরিয়ে দিলেন মা।
ঠিক ১০টায় রেস্ট হাউসের সামনে জিপ অপেক্ষা করছিল। তিনজন জিপগাড়িতে উঠে বসতেই বাঘাইহাটের সরু রাস্তা ধরে সাঁই-সাঁই করে ছুটে চলল। একটা সময় বাঘাইহাটের মূল চেকপোস্টের সামনে এসে গাড়ি থামাল। এখান থেকে সব গাড়িকে স্কট দিয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গাড়ি পৌঁছে দেবে সাজেক পর্যন্ত।
তুবা ভীষণ খুশি! ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে এখান থেকে ওখানে। আকাশসম খুশিতে আত্মহারা ও। হঠাৎ একজন সেনা অফিসার মাইকে ঘোষণা দিলেন—‘সাজেক যাওয়ার উদ্দেশ্যে যেসব পর্যটক এসেছেন, সবাই নিজ নিজ গাড়িতে বসে পড়ুন। ঠিক ১১টায় সব গাড়ি ছেড়ে যাবে এখান থেকে। সামনে থাকবে পুলিশের গাড়ি, পেছনে সেনাবাহিনীর গাড়ি।’
কথা শুনে তুবার হাত ধরে জিপের পেছনে উঠে পড়লেন মা। সঙ্গে বাবাও।
সব গাড়ি স্টার্ট দিল একসঙ্গে। বাইকের সারি, সিএনজি, মাহেন্দ্র আর জিপগাড়ি। ছুটে চলল সাজেকের উদ্দেশে।
প্রায় ঘণ্টা দুয়েক চলার পর সেনাবাহিনীর নিরাপদ এলাকায় প্রবেশ করে। একজন সেনা অফিসার ইশারা দিলেন চালককে—একেবারেই শেষ প্রান্তে নিয়ে যেতে। চালক ছুটে চললেন মাটির সরু রাস্তা ধরে যতদূর যাওয়া যায়। অনেক উঁচুনিচু রাস্তা পেরিয়ে প্রায় রাস্তার শেষে গিয়ে থেমে যায় জিপ।
‘এই যে মা, আমরা সাজেক এসে পড়েছি,’ তুবাকে বাবা বলেন।
আকাশ খুব শান্ত। কখনো মেঘ, কখনো রোদ। মেঘলা ভাব, কিন্তু বৃষ্টি নেই। রোদের তেমন তাপও নেই।
তুবা বাবার হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে এগিয়ে গেল। পেছন পেছন মা।
পাহাড়ের চূড়ায় উঠেই তুবা হাততালি দেয়; বলে, ‘মা মা! আমি আকাশটাকে ছুঁয়ে দেখি?’
মা অবাক হলেন—‘না, মা, খাদে পড়ে যাবে। নিচে তাকিয়ে দেখো কত মেঘ। সাদা আর ছাই রঙের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে মেঘের ভেলা তৈরি করেছে।’
তাই দেখে তুবা হাঁ করে চেয়ে রয়েছে।
‘আমাদের দেশ কত্ত সুন্দর, তাই না মা?’
‘একদম মা। অনেক সুন্দর। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য এখানে আসলে উপভোগ করা যায়।’
বাবা ছবি তুলতে লাগলেন। কখনো মায়ের সঙ্গে তুবা। কখনো তুবা একা প্রকৃতির সঙ্গে দাঁড়িয়ে। কখনো বাবাসহ সেলফি।
আচমকা ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভেঙে যায় তুবার। তাকিয়ে দেখে মা ডাকছেন—‘ওঠ মা, তাড়াতাড়ি উঠে পড়! সাজেক যাবি না!’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


বৃষ্টিভেজা শৈশবের স্মৃতি