স্মৃতির ডানায় বাংলা নববর্ষ

মশিউর রহমান

স্মৃতির ডানায় বাংলা নববর্ষ

১. বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নানা বর্ণে, পোশাকে, রঙে, গানে, ঢোলের বাজনায় ও বাঁশির সুরে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়েছে। বৈশাখ আসতে না আসতেই শুরু হয়ে গেছে কালবৈশাখীর তাণ্ডব। আকাশটা মেঘলা এবং উথালপাতাল বাতাস আর হালকা বৃষ্টি ভর করেছে প্রকৃতিতে। প্রচণ্ড রোদের তাপে জনজীবন যখন অতিষ্ঠ, তখনই ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে উড়োবৃষ্টি নিয়েই বাঙালির জীবনে আসে পহেলা বৈশাখ।

পুরোনো দুঃখ-কষ্ট সবকিছু দূরে ঠেলে নতুন বছরে সবকিছু নতুন করে শুরু করার জন্য বাঙালিমাত্রই নববর্ষকে আনন্দ-উল্লাসের সঙ্গে বরণ করে। নববর্ষ ঘিরে রয়েছে বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। বাঙালির চিরচেনা সংস্কৃতির ধারায় শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সি নারী-পুরুষই নববর্ষ উদ্‌যাপন করে। লাল-সাদা শাড়ি, পাঞ্জাবি ও ফতুয়ার মতো বৈচিত্র্যময় পোশাকে সেজে গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত সব প্রান্তের মানুষ এই উৎসবে মেতে ওঠে। নববর্ষে গ্রাম থেকে শহরে সর্বত্রই বৈশাখী মেলা বসে। মেলাতে নাগরদোলা, মাটির পুতুল ও গ্রামীণ জিনিসপত্র দেখা যায়। দোকানগুলো সেজে ওঠে নতুন সাজে; পুরোনো সব দেনা-পাওনার হিসাব চুকিয়ে নতুন করে হালখাতা খোলা হয়। গৃহবধূরা নতুন চালের পায়েস রান্না করে।

বিজ্ঞাপন

২. ছোটবেলায় নববর্ষ ঘিরে আমার জীবনে রয়েছে সোনায় মোড়ানো স্মৃতি। সেসব মজার স্মৃতিই পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করছি।

ছোটবেলায় দাদা-দাদিসহ পরিবারের গুরুজনেরা ছোটদের বলতেন, বছরের প্রথম দিনটি যদি ভালোভাবে কাটে, তাহলে নাকি পুরোটা বছরই ভালোভাবে কাটবে। পহেলা বৈশাখ তথা বছরের প্রথম দিনটি আমাদের পরিবারে বিশেষভাবে পালন করা হতো। সকালভোরে ঘুম থেকে উঠে যেতাম, যাতে সারা বছরই খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারি। এরপর গোসল করতাম, যাতে পুরোনো বছরের সব রোগবালাই ধুয়ে-মুছে যায়। এরপর বই নিয়ে পড়তে বসতাম। পড়া হোক বা না হোক অবশ্যই বই নিয়ে বসতে হতো, যাতে সারা বছর বই নিয়ে পড়তে বসা হয়।

বাবার হাত ধরে যেতাম মুদি দোকানে ‘হালখাতা’ খেতে। মুদি দোকানে গিয়ে বাবা দোকানির কাছে কিছু টাকা দিতেন আর দোকানি বাবাকে ও আমাকে পিরিচে করে মিষ্টি ও দই খেতে দিতেন। তখন বুঝতাম না যে হালখাতা খাওয়া কী? হালখাতা মানে পুরোনো বছরের খাতার দায়-দেনা পরিশোধ করে নতুন খাতা খোলা। পহেলা বৈশাখে এখনো এই রেওয়াজ গ্রামে ও শহরে রয়েছে।

৩. আমাদের বাড়িতে আমার দাদার আমল কিংবা তারও কয়েক পুরুষ আগে থেকেই সকালে পান্তাভাত খাওয়ার রেওয়াজ ছিল। রাতে মাটির হাঁড়িতে ভাত রান্না করে পানি দিয়ে রাখা হতো। মসুর ডাল আর আলু ভর্তা দিয়ে সেই পান্তাভাতই ছিল আমাদের সকালের খাবার। মাটির হাঁড়ির সেই পান্তাভাতে যে কী মজা, তা বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু ঢাকা শহরে এসে ইলিশ ভাজা এবং বিভিন্ন রকমের ভর্তা দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার চল শুরু হয়েছে।

ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখের সময় সব থেকে মজার বিষয়টি ছিল বন্ধু-বান্ধব নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানো, মেলায় ঘুরতে যাওয়া আর রাতে পুতুলনাচ দেখা। সারা দিন বন্ধুদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে জিলাপি ও মিষ্টি খেতাম।

আমাদের গ্রামে বসত বৈশাখী মেলা। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সকাল থেকে দুপুর অবধি মেলায় ঘুরে বেড়াতাম। কত রকমের জিনিসের পসরা নিয়ে দোকানিরা মেলায় আসত। মেলার জন্য মায়ের কাছ থেকে পেতাম সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা। কখনো কখনো বাবার কাছ থেকেও পাঁচ টাকা পেতাম। সেই টাকা দিয়েই কত কিছু কিনে ফেলতাম—আমকাটা ছুরি, লাটিম, ঘুড়ি, কিছু গুলি (মার্বেল) ইত্যাদি। আর ছোট বোনের জন্য অবশ্যই রেশমি চুড়ি কিনতাম। এসব কিনেও যদি টাকা থাকত, তাহলে অবশ্যই বাতাসা কিনতাম। ছোটবেলায় এসব জিনিস আমার খুব প্রিয় ছিল। বিকেলে মেলায় ঘুরতে যেতাম বন্ধুদের নিয়ে। নাগরদোলায় উঠতাম, যদিও ভয়ে বুক কাঁপত। তাছাড়া আমাদের গ্রামে পহেলা বৈশাখের রাতে ‘পুতুলনাচ’ বসত। ‘পুতুলনাচ’ দেখতে কখনো ভুলতাম না।

ছোটবেলায় পহেলা বৈশাখ আমার এভাবেই কেটেছে। তবে এখন শহরের জীবনে পহেলা বৈশাখ ভিন্নভাবে উদ্‌যাপিত হয়। আমার ছোটবেলার মুছে যাওয়া নববর্ষের কিছু স্মৃতি পাঠকদের সঙ্গেও মিলে গেছে নিশ্চয়ই। পুরোনো সব দুঃখ-কষ্ট ও রোগ-শোক বিদায় করে নতুন বছর সবার ভালো কাটুক—সেই প্রত্যাশায় সবাইকে আবারও ‘শুভ নববর্ষ’।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন