গ্রামের বাজারে তখন দুপুর গড়িয়েছে। ছায়া নেই, ঘামছে শরীর, মাথার ওপর একরাশ আগুন। গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে নাঈম এসে দাঁড়াল বাজারের পুরোনো মোড়টায়। বাইসাইকেলের পেছনে একটা ব্যাগ—তাতে সংসারের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। মায়ের আশঙ্কা ছিল—‘বৃষ্টি আসতে পারে, ছাতা নিও!’ কিন্তু নাঈম তা আর কানে তোলেনি।
হঠাৎ বাতাসে একটা অচেনা ঠান্ডা ভাব। তারপর একটানা শব্দ—টুপ… টুপ… টুপ…। তারপরই হু-হু করে ঝমঝমিয়ে নামল বৃষ্টি।
নাঈম দৌড়ে ঢুকে পড়ল পাশের এক পুরোনো চায়ের দোকানে। বাঁশ আর টিনে গড়া, দেয়ালে ধুলোজমা ক্যালেন্ডার, এক কোণে ধোঁয়াওঠা কেটলি। দোকানের এক কোণে বসে থাকা বয়স্ক মানুষটি তাকাল তার দিকে—হালকা সাদা দাড়ি, চোখে মায়া মেশানো কৌতূহল।
‘নতুন মুখ?’ লোকটা জিজ্ঞেস করলেন।
‘জামরুলপুরেই থাকি এখন,’ নাঈম বলল, ‘বাবা-মায়ের কাছে। শহর থেকে এসেছি কয়েক দিনের জন্য।’
লোকটা মাথা নেড়ে হাসলেন, ‘শহর থেকে যারা আসে, তারা ছাতা আনতে ভুলে যায়। এই ভুলের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে গ্রামের ঘ্রাণ। হা হা হা...।’
নাঈম তাকাল আশেপাশে—চায়ের পেয়ালা, সস্তা বিস্কুটের প্যাকেট, ভেজা মেঝেতে বৃষ্টির প্রতিচ্ছবি। তখনই তার চোখে পড়ল এক ছোট্ট ছেলে—ভেজা জামা, হাতে ছাতা আর বাঁশি। চুপচাপ বসে আছে, বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে।
‘তুই একা এসেছিস?’ নাঈম জিজ্ঞেস করল।
ছেলেটা মাথা নাড়ল, ‘আব্বা অসুস্থ। তার জন্য ছাতা কিনতে এসেছিলাম। হঠাৎ বৃষ্টি…।’
দোকানদার সামনে এগিয়ে এলেন, হাতে ধোঁয়াওঠা চা। কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘এই দোকানে তোর বাবাও বসত একসময়। তখন তুই ছিলি বাবার কাঁধে চেপে ঘোরা এক ছোট্ট বালক।’
নাঈম থমকে গেল।
‘চিনলেন আমাকে?’ সে অবাক।
“তোর বাবার নাম আনোয়ার। যেদিন শহরে চলে গেলেন, তার আগের দিন এখানেই বসে বললেন, ‘ফিরে আসব একদিন।’ আমি সেই কথাটা ভুলিনি।”
বৃষ্টির শব্দ তখন যেন সময়ের ঘড়ি। বাইরে মেঘ আর ভিজে পাখিরা, ভেতরে নাঈমের বুকের মধ্যে বেজে ওঠে পুরোনো দিনের সুর।
হঠাৎ ছেলেটি পকেট থেকে একটা লিচু বের করে নাঈমের দিকে বাড়িয়ে দিল।
‘আমাদের গাছের। এইটা দারুণ মিষ্টি,’ সে বলল সরল গলায়।
নাঈম লিচুটা হাতে নিল। সেই গন্ধ—ভেজা মাটি, কাঁচা ছেলেবেলা, মা’র মুখ, বাবার সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি।
বৃষ্টি তখন প্রায় থেমে এসেছে।
নাঈম উঠতে উঠতে বলল, ‘আপনারা যেন একটা পুরোনো গল্পের পাতা খুলে দিলেন।’
জব্বার কাকু হাসলেন, ‘গল্প নয় বাবা—এটাই জীবন। শুধু আমরা মাঝেমধ্যে ভুলে যাই।’
বাজারের রাস্তায় ভিজে পায়ের ছাপ রেখে হাঁটে নাঈম।
লিচুটা মুখে দেয়—মিষ্টির চেয়ে বেশি কিছু এক রকম অনুভব গেঁথে যায় তার হৃদয়ে।
একটা বিকেল, একফোঁটা বৃষ্টি, আর একটা ছাতাহীন ভুল—সেই ভুলেই সে খুঁজে পায় নিজের হারিয়ে যাওয়া শেকড়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

