সমুদ্রের অতল তলে যেখানে সূর্যের আলো কোনোদিন পৌঁছায় না, সেখানে নীরব ও অন্ধকার জগতে লুকিয়ে থাকে এক রহস্যময় প্রাণী ভ্যাম্পায়ার স্কুইড। নামটি শুনলেই যেন শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়, ঠিক যেন কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির ভয়ংকর চরিত্র! অথচ বাস্তবেই আছে এই প্রাণীটি। প্রকৃতির আশ্চর্য এই সৃষ্টির নাম Vampyroteuthis infernalis, যার অর্থ নরকের ভ্যাম্পায়ার স্কুইড।
নামকরণ : ভ্যাম্পায়ার স্কুইড (Vampire Squid) নামটি এসেছে এর বৈজ্ঞানিক নাম Vampyroteuthis infernalis থেকে, যার অর্থ নরকের ভ্যাম্পায়ার স্কুইড। নামটি দিয়েছেন জার্মানির প্রাণীবিজ্ঞানী Carl Chun ১৯০৩ সালে। প্রাণীটি অন্ধকার গভীর সমুদ্রে বাস করে। কালচে লাল রঙ এবং জালের মতো আবরণযুক্ত বাহুর জন্য একে ভয়ানক দেখায়। এ কারণেই ‘ভ্যাম্পায়ার’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে।
বাসস্থান ও খাদ্য : ভ্যাম্পায়ার স্কুইড সাধারণত পৃথিবীর উষ্ণ ও গরম সমুদ্রের গভীরে প্রায় ৬০০ থেকে ৯০০ মিটার নিচে থাকে। এ অঞ্চলকে বলা হয় oxygen minimum zone (OMZ), যেখানে আলো থাকে না এবং অক্সিজেনের পরিমাণও খুব কম। এরা খায় marine snow, অর্থাৎ গভীর সমুদ্রের পানিতে ভেসে থাকা মৃত প্রাণীর অংশ, প্ল্যাংকটন ও জৈব কণিকা। তারা তাদের দুই বাহুতে থাকা filament ছড়িয়ে দিয়ে এগুলো জড়ো করে, তারপর মুখে নিয়ে নেয়। এটি একধরনের ‘Passive Feeding Method’।
গঠনগত বৈশিষ্ট্য : এটি স্কুইড এবং অক্টোপাসের মধ্যবর্তী একটি প্রাণী বলে বিবেচিত এবং এদের দেহে photophores ও নরম স্পাইক থাকে, যা বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত।
এর দেহজুড়ে রয়েছে ফোটোফোর নামের অদ্ভুত আলোকোজ্জ্বল অঙ্গ, যেখান থেকে নির্গত হয় নীলচে এক আলো। শত্রু এলেই হঠাৎ করেই শরীরজুড়ে জ্বলে ওঠে এই আলো। এটি কখনো আবার নিজেকে ঘিরে ছড়িয়ে দেয় একপ্রকার ঘন জেলির মতো বস্তু, যেন ধোঁয়ার পর্দা টেনে সে গায়েব হয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রাণীটি স্কুইড বা অক্টোপাস কোনোটিই পুরোপুরিভাবে নয়; বরং এটি উভয়ের মধ্যবর্তী এক অদ্ভুত ধাঁচের প্রাণী। এর আটটি বাহুতে থাকে নমনীয় স্পাইক বা কাঁটা, যা দিয়ে সে নিজেকে রক্ষা করে এবং শিকার ধরে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ এটি মানুষ কিংবা বড় প্রাণীর কোনো ক্ষতি করে না। বরং সমুদ্রের ভাসমান মৃত অংশ, জেলিফিশ কিংবা অণুজীবই এর খাদ্য।
বিজ্ঞানীরা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি এই ভ্যাম্পায়ার স্কুইডের সব রহস্য। এটি যেন প্রাণিজগতের এক জীবন্ত ধাঁধা—চলাফেরায় ধীর, আচরণে গম্ভীর, আর চেহারায় এক মহাজাগতিক বিস্ময়। সমুদ্রের গহিনে এমন এক প্রাণীর অস্তিত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর এবং সুন্দর গল্পগুলো আমরা এখনো পুরোটা জানি না। ভ্যাম্পায়ার স্কুইড শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের খোরাক নয়, বরং প্রকৃতির অজানা অধ্যায়গুলোর এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


সোনালু গ্রীষ্মের সোনাঝরা সৌন্দর্য