ভারী খাবার গ্রহণের পর আমাদের পেটে স্বাভাবিকভাবেই হজমশক্তি ধীর হয়ে যায়। এতে পেট ফাঁপা, বদহজম, পেটে ব্যথা ও বমির মতো নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা আমাদের সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। হজম প্রক্রিয়া এমন একটি প্রক্রিয়া, যার জন্য যথেষ্ট শক্তি ব্যয় হয়। কেননা খাবার গ্রহণ করার পর শরীরকে প্রচুর পরিমাণ রক্ত পাকস্থলী এবং অন্ত্রে প্রবাহিত করতে এবং অ্যাসিড, এনজাইম এবং পুষ্টি ভেঙে ফেলার মতো প্রয়োজনীয় গতিশীলতা নির্গত করতে হয়। আর কোনো কারণে যদি এনজাইমের উৎপাদন হ্রাস পায় (বয়স, পুষ্টির ঘাটতি কিংবা ওভারলোড খাবারের কারণে), তাহলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় ধরে খাবার পেটে স্থির থাকে। আর তখনই পেট ভারীবোধ অনুভূত হয়। অধিক তেল মসলাযুক্ত খাবার, স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো অতিরিক্ত গ্রহণে পেটে গ্যাস, অ্যাসিডিটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি খাবার অনন্ত দু থেকে তিন ঘণ্টার বিরতি থাকা প্রয়োজন। ভারী খাবার খেলে শুধু শারীরিক সমস্যা তৈরি করে না, এটি মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করে। আসুন জেনে নেওয়া যাক, ভারী খাবার গ্রহণের পর কী ধরনের খাবার গ্রহণ করবেনÑ
হালকা গরম পানি
খাবার খাওয়ার ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর হালকা গরম পানি পান করতে পারেন। এর সঙ্গে একটু লেবুর রস আর সামান্য লবণ মিশিয়ে খেলে শরীর বিপাক হার বৃদ্ধি পাবে এবং টক্সিন বেরিয়ে আসবে। তবে খাওয়ার মাঝখানে পানি পান করবেন না। এছাড়া খাওয়ার পরপরই কখনোই চা ও কফি খাবেন না। এ ধরনের পানীয়তে ফেনোলিক নামক যৌগ ও ক্যাফেইন থাকে, যা খাবার থেকে পুষ্টি শোষণ করতে বাধা দেয়।
দই
যেকোনো ভারী খাবার খেয়ে তার ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর প্রোবায়োটিক খাবার খান। সবচেয়ে ভালো উপকার পাবেন টকদই খেলে। এটি দ্রুত হজমশক্তি হওয়ার পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক করবে। দইয়ের সঙ্গে ভাজা জিরা মিশিয়ে নিতে পারেন। এতে আরো ভালো কাজে দেবে।
বোরহানি
খাবারের শেষে বোরহানি বা লাচ্ছি, মাঠা গ্রহণ করতে পারেন। এতে হজমে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
আদা এবং জিরা পানি
আদায় রয়েছে জিঞ্জেরল নামক উপাদান, যা শরীরকে দ্রুত খাবার ভাঙতে সাহায্য করে এবং বমি বমি ভাব কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া অতিরিক্ত খাবার খেলে পেট খারাপের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। জিরাতে থাকা কারমিনেটেভ পেটের গ্যাস কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। জিরা পানি তৈরির জন্য প্যাকেটের জিরা দিয়ে পানীয় বানাবেন না।
মৌরি বীজ
মৌরি পরিপাকতন্ত্রের পেশিগুলো শিথিল করতে সাহায্য করে, যা পেটের বদহজম, পেট ফাঁপা ও গ্যাসের অস্বস্তি ভাব কমাতে সাহায্য করে। ভারী খাবারের পরে এক চা চামচ মৌরি বীজ চিবিয়ে খান।
আপেল সাইডার ভিনেগার
আপেল সাইডার ভিনেগার হজমের জন্য চমৎকার। পানির সঙ্গে মিশিয়ে খেলে এটি পাকস্থলীতে আরো অ্যাসিড তৈরি করতে সাহায্য করে, যা খাবার ভাঙার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারী খাবারের আগে বা পরে এক গ্লাস পানিতে এক চা চামচ আপেল সাইডার ভিনেগার মিশিয়ে পান করলে পেট ভালো রাখতে সাহায্য করবে।
ফল
আমরা অনেকেই জানি ফল খেলে হজম শক্তি বৃদ্ধি পাবে। সে ক্ষেত্রে এনজাইমসমৃদ্ধ ফল বেছে নেওয়াই ভালো। যেমন : পেঁপে বা আনারস। পেঁপেতে থাকা পাপাইন এনজাইম এবং আনারস থাকা ব্রোমেলেন এনজাইম প্রোটিনকে নরম করে, যা ভারী খাবার হজম করে তোলে। কিন্তু যাদের পেটের সমস্যা আগে থেকেই যেমন : আইবিএসজনিত, তাদের জন্য ভালো নাও হতে পারে। তারা এসব খাবার পরে গ্রহণ করতে পারেন বিকেলে বা সন্ধ্যায়।
ডিটক্স পানীয়
ভারী খাবারের পর পানিতে সামান্য লেবু মিশিয়ে শসা, পুদিনা কিংবা তেঁতুল পানিও খেতে পারেন ডিটক্স করে। এতেও হজমশক্তি উন্নত হবে।
হাটুন
খুব বেশি খাওয়ার পর হঠাৎ শরীরচর্চা করবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। এর পরিবর্তে হালকা হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। কিন্তু ভারী ব্যায়াম করবেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের পর ১৫ থেকে ২০ মিনিট হাঁটলে হজমশক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও থাকে।
লেখক : পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ
কেয়ার হসপিটাল, দিনাজপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

