প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ওজন বৃদ্ধি পেলে ক্যানসারের ঝুঁকি পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ৬০ লাখেরও বেশি রোগীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের কারণে ১৩ ধরনের ক্যানসার হতে পারে এবং আরো ৮ ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে ঠিক কী পরিমাণ ওজন বাড়লে এবং জীবনের কোন সময়ে ওজন বাড়লে ক্যানসারের ঝুঁকি কেমন হয়, সে বিষয়ে এত দিন কম তথ্য জানা ছিল।
বিষয়টি জানতে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ৬০ লাখের বেশি নারী ও পুরুষের ওজন এবং ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তারা দেখেছেন, মানুষের জীবনে এমন কোনো নিরাপদ বয়স নেই যখন ওজন বাড়লে ক্ষতি হবে না।
ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত 'ইউরোপিয়ান কংগ্রেস অন ওবেসিটি'-তে উপস্থাপিত এই গবেষণায় ১৭ থেকে ৬০ বছর বয়সী আড়াই লাখের বেশি পুরুষ এবং প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার নারীর ওজন গড়ে চারবার পরিমাপ করা হয়। একই সঙ্গে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের ক্যানসার শনাক্তের বিষয়টিও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষকেরা দেখেছেন, প্রথম জীবনে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময়ের অতিরিক্ত ওজন এবং পরবর্তীতে পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে ওজন বৃদ্ধি উভয় ক্ষেত্রেই ক্যানসারের সামগ্রিক ঝুঁকি এবং নির্দিষ্ট কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও লুন্ড ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্টন নিলসন বলেন, ‘শুরুর দিকে ওজন যত বেশি থাকবে এবং পরবর্তীতে যত বেশি ওজন বাড়বে, ক্যানসারের ঝুঁকি তত বেশি হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।’
গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ বছর বয়সের আগে যে পুরুষেরা স্থূলতায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি পাঁচ গুণ, অগ্ন্যাশয় ও কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি দ্বিগুণ এবং কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি সুস্থ ও স্বাভাবিক ওজনের পুরুষদের চেয়ে ৫৮ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, ৩০ বছরের আগে স্থূলতায় আক্রান্ত নারীদের জরায়ুর ক্যানসারের (এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যানসার) ঝুঁকি সাড়ে চার গুণ, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি ৬৭ শতাংশ বেশি, কিডনি ক্যানসারের ঝুঁকি দ্বিগুণ এবং মেনিনজিওমা (এক ধরনের টিউমার) হওয়ার ঝুঁকি কখনো স্থূল না হওয়া নারীদের চেয়ে ৭৬ শতাংশ বেশি।
জীবনের শেষভাগে এসে যাদের ওজন বাড়ে, তাদের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। নারীদের ক্ষেত্রে, ৩০ বছর বয়সের পর ওজন বাড়ার সঙ্গে জরায়ুর ক্যানসার, মেনোপজ-পরবর্তী স্তন ক্যানসার এবং মেনিনজিওমার ঝুঁকির তীব্র সম্পর্ক রয়েছে, এসব ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে যৌন হরমোনকে দায়ী করা হয়। এ ছাড়া নারীদের ওজন পরিবর্তনের সঙ্গে কোলন ক্যানসারেরও শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে স্থূলতাজনিত ক্যানসারের ঝুঁকি ৪৫ বছরের কম বয়সে ওজন বাড়ার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত ছিল, বিশেষ করে খাদ্যনালী ও লিভার ক্যানসারের ক্ষেত্রে।
নিলসন বলেন, ‘এর কারণ হতে পারে, জীবনের শুরুর দিকে ওজন বাড়লে তা শরীরের টিস্যুগুলোতে প্রদাহ এবং ইনসুলিনের মাত্রা বৃদ্ধির মতো জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোর কাজ করার জন্য বেশি সময় দেয়।’
যারা সবচেয়ে বেশি ওজন বাড়িয়েছেন (গড়ে ৩২ কেজি), তাদের ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে কম ওজন বাড়ানোদের (গড়ে ৮ কেজি) চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি ওজন বাড়ানো পুরুষদের লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় তিন গুণ এবং খাদ্যনালীর ক্যানসারের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ছিল।
এ ছাড়া তাদের পিটুইটারি টিউমারের ঝুঁকি তিন গুণ এবং রেনাল সেল কার্সিনোমা, গ্যাস্ট্রিক কার্ডিয়া ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি ৫০ শতাংশের বেশি ছিল।
সবচেয়ে বেশি ওজন বাড়ানো নারীদের জরায়ুর ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় চার গুণ, পিটুইটারি টিউমারের ঝুঁকি দ্বিগুণ এবং রেনাল সেল কার্সিনোমা ৯১ শতাংশ , মেনোপজ-পরবর্তী স্তন ক্যানসার ৪ শতাংশ, মেনিনজিওমা ৩২ শতাংশ ও কোলন ক্যানসারের ৩১ শতাংশ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা তুলনামূলক কম পরিমাণে ওজন বাড়িয়েছেন, তাদেরও ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকে। ফলে অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিই এখানে ফুটে উঠেছে।
নিলসন আরো বলেন, ‘আমাদের ফলাফল কোনো নির্দিষ্ট হস্তক্ষেপ বা আচরণের কথা না বললেও, এটি পুরো প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে একটি স্থিতিশীল ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার গুরুত্বকে তুলে ধরে।’
ক্যানসার রিসার্চ ইউকে-র হেলথ ইনফরমেশন ম্যানেজার মেগান উইন্টার বলেন, ‘প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে আমাদের চারপাশের পরিবেশের কারণে এটি কঠিন হতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সে কারণেই সবার জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরিতে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা সীমিত করা, স্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির ওপর বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং পুষ্টিকর খাবার সবার কাছে সহজলভ্য করার মতো আরো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা স্থূলতার হার কমাতে এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করতে সাহায্য করতে পারে।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


