গত দুই দশকে পাঁচ কোটিরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা প্রতি বছর প্রায় ৯৪ হাজার শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে জড়িত বিভিন্ন পর্যায়ের ৪০ শতাংশ পদই শূন্য। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে নেই তদারকি। এতে করে বাড়ছে টিকার অপচয় ও টিকা না পাওয়ার হার।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলরুমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত ‘বাংলাদেশে টিকা কার্যক্রমের সাফল্য, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এ তথ্য জানায়।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের যৌথ অ্যাডভোকেসি প্রোজেক্টের আওতায় সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সহায়তায় দেশের বিভিন্ন জেলায় টিকাদান কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা, প্রতিবন্ধকতা এবং করণীয় বিষয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ। এসময় তিনি বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির বর্তমান প্রতিবন্ধকতা এবং উত্তরণের উপায়সমূহ নিয়ে উক্ত আলোচনা করেন।
নির্বাহী পরিচালক বলেন, পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যক্ষ তদারকির অভাবে টিকার অপচয়, টিকা না পাওয়া শিশু এবং ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে টিকাদানকারী ও জনগণের মধ্যে আন্ত:ব্যক্তিক যোগাযোগ সীমিত এবং শহরাঞ্চলেও এটি অনুপস্থিত।
নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারের ইপিআই দেশের জনস্বাস্থ্যে এক বৈশ্বিক সাফল্য হিসেবে স্বীকৃত। এই জীবনরক্ষাকারী টিকাদানের মাধ্যমে মা ও শিশুস্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন হয়েছে এবং মা ও শিশু মৃত্যুহার কমেছে এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলে টিকাদানের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুহার ৮১ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে, যা শুধুমাত্র বাংলাদেশ, নেপাল, রুয়ান্ডা, ভিয়েতনাম, ইথিওপিয়া ও মালাউই—মোট ছয়টি দেশেই অর্জিত হয়েছে। টিকায় বিনিয়োগকৃত প্রতি ১ ডলারে ২৫ দশমিক ৪ ডলার ফেরত আসে, যা প্রমাণ করে টিকা স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের অন্যতম সেরা বিনিয়োগ। বাংলাদেশ পোলিও নির্মূল, মাতৃ ও নবজাতক ধনুষ্টংকার নির্মূল এবং হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে। কিশোরী মেয়েদের মধ্যে ৯৩ শতাংশকে এইচপিভি টিকার আওতায় আনা গেছে, যা মহিলাদের সার্ভিকাল ক্যান্সার (জরায়ু ক্যান্সার) প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নির্বাহী পরিচালক বলেন, ইউনিসেফের সহায়তায় ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ৬১টি জেলায় এবং ইপিআই সদর দপ্তরে মোট ১২০টি উদ্ভাবনী ওয়াক-ইন কুলার রুম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ১২ অক্টোবর থেকে টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে নতুন টিকা টিসিভি ক্যাম্পেইন চালু করতে যাচ্ছে এবং ২০২৬ সালে আরো নতুন টিকা ইপিআই কর্মসূচির আওতায় যুক্ত হবে। তবে ইপিআই কার্যক্রম বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান রয়েছে। টিকাদান প্রকল্পে বরাদ্দকৃত জনবলের প্রায় ৪০ শতাংশ পদ এখনো শূন্য। টেকনিশিয়ান/পর্যবেক্ষকসহ ইপিআই সদর দপ্তরের শূন্যপদ ৪৩ শতাংশ। ৪৫ জেলায় টিকাদান কর্মী নিয়োগ এখনো সম্পন্ন হয়নি। জেলা পর্যায়ের কোল্ড চেইন টেকনিশিয়ানের ৫৩ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। বাজেট বরাদ্দে দেরি এবং পঞ্চম স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) বাতিল এবং তার পরিবর্তে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিটি) তৈরি করা হয়েছে যা এখনো অনুমোদিত হয়নি, এর ফলে টিকা ক্রয়, টিকা পরিবহণ এবং বণ্টনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, যদি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুর মধ্যে টিকা ক্রয়ের অর্থ ছাড়ে বিলম্বিত করে, তবে ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কিছু টিকার মজুদ ফুরিয়ে যাবে। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থার ভিত্তিতে টিকাদান কেন্দ্র এবং কর্মীদের সুষ্ঠু বণ্টন নেই। দুর্গম ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত টিকাদান কেন্দ্র ও কর্মী নেই, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় কার্যকর টিকাদান কৌশল এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কার্যক্রমে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এছাড়া জনসংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ না হওয়ায় টিকাদানের লক্ষ্য নির্ধারণে অসামঞ্জস্যতা এবং টিকা বরাদ্দে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে সরকারের পক্ষে ইপিআই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুদের জন্যে ‘টাইফয়েড টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৫’ আওতায় টিসিভি টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যম স্কুলসহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যয়নরত সব ছাত্র-ছাত্রী (প্লে/নার্সারি, কিন্ডারগার্টেন থেকে ৯ম শ্রেণি/সমমান শ্রেণি) এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত কমিউনিটির ৯ মাস-১৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫ কোটি শিশুকে এই টিকা প্রদান করা হবে। টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ১৭ ডিজিটের জন্মনিবন্ধন নাম্বার দিয়ে নিচের লিংকে প্রদত্ত ফর্মে নিবন্ধন করতে হবে। লিংক https://vaxepi.gov.bd/registration/tcv
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের টিকাদান কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মো. শফিকুল ইসলাম রাজিব, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ সিএসও কোয়ালিশন ফর হেলথ অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. নাসরিন আক্তার উপস্থিত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

