টানা কয়েকদিন বা কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও জনপদে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কোথাও দিনের পর দিন সড়কে পানি জমে থাকে, কোথাও আবার দীর্ঘ সময় ধরে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ বিরাজ করে।
অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পাশাপাশি নদীগুলোয় উজানের পানির ঢলে দেশের অনেক এলাকায় বন্যা দেখা দেয়; দিনের পর দিন পানিবন্দি হয়ে থাকতে হয় বহু মানুষকে। এমন দুর্যোগে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তি, দুর্ভোগের পাশাপাশি বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।
সড়কে, বাড়িঘরে, স্কুলে জমে থাকা ওই পানি, অতিরিক্ত আর্দ্র পরিবেশ এবং অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ খাবার পানির সংকটের মতো নানাবিধ কারণে বর্ষাকালে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা থাকে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, ডেঙ্গু, বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস এ এবং ই-এর মতো পানিবাহিত সংক্রমণের।
তবে সব রোগের কারণ এক নয়। এগুলোর কোনোটি দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়, কোনোটি মশাবাহিত, আবার কোনোটি দীর্ঘ সময় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকার কারণে।
তাই জলাবদ্ধতা বা বন্যার মতো পরিস্থিতিতে সুস্থ থাকতে হলে শুধু রোগের নাম জানলেই হবে না, জানতে হবে কোন রোগ কী কারণে হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন এবং কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের সতর্কতা নিলে, সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
বন্যা ও জলাবদ্ধতাকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন জানান, বন্যার সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ খাবারের সংকট। এর ফলে ডায়রিয়া ও কলেরার মতো রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ডায়রিয়া ও কলেরা
দূষিত পানি বা পচা খাবার থেকে ডায়রিয়া হয়। এতে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও খনিজ লবণ বের হয়ে রোগী নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। কলেরার প্রধান লক্ষণ হলো তীব্র ডায়রিয়া ও ক্রমাগত বমি হওয়া। এই রোগে চাল-ধোয়া পানির মতো পাতলা পায়খানা হয় এবং দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি হয়ে রোগী শকে চলে যেতে পারে। এই দুই ক্ষেত্রেই রোগীকে দ্রুত ওআরএস বা ওরস্যালাইন খাওয়াতে হবে।
দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত ঝুঁকি
বন্যার সময় শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়ার এবং সাপের কামড়ের ঘটনা বাড়ে। পানিতে হাঁটার সময় ধারালো বস্তুর আঘাতে পায়ে ক্ষত হতে পারে, যা থেকে ধনুষ্টংকারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বন্যার পরে দেখা দেওয়া রোগসমূহ
কিছু রোগ বন্যা বা জলাবদ্ধতা তৈরির কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর প্রকাশ পায়।
টাইফয়েড
এটি পানি ও খাদ্যবাহিত একটি অন্যতম রোগ। এর প্রধান লক্ষণ হলো দীর্ঘদিন জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা ও পেটব্যথা। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৮ হাজার মানুষ মারা যান, যার ৬৮ শতাংশই শিশু।
হেপাটাইটিস এ ও ই
জলাবদ্ধতার কারণে জন্ডিসের মতো লক্ষণযুক্ত এই দুই হেপাটাইটিসের প্রকোপ বাড়ে। এটি গর্ভবতী মায়েদের জন্য বেশ ক্ষতিকর হতে পারে। নিরাপদ পানির ব্যবহারই এই রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়।
চর্মরোগ ও স্ক্যাবিস
আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে থাকার ফলে স্ক্যাবিসসহ বিভিন্ন চর্মরোগ দ্রুত ছড়ায়। চর্মরোগের দ্রুত চিকিৎসা না হলে তা থেকে কিডনির সমস্যাও হতে পারে।
অন্যান্য সংক্রমণ
আশ্রয়কেন্দ্রে দীর্ঘদিন থাকার ফলে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া ও হাঁপানি বাড়তে পারে। নিরাপদ টয়লেট ও স্বাস্থ্যবিধির অভাবে নারীদের ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) হতে পারে। এ ছাড়া অ্যানথ্রাক্স এবং ইঁদুরের প্রস্রাব থেকে লেপ্টোস্পাইরোসিস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
বন্যার পানির সময় ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিয়ে একটি ভুল ধারণা রয়েছে। ডা. মুশতাক হোসেন জানান, বন্যার পানিতে এডিস মশার লার্ভা ভেসে যায়। তবে পানি নেমে যাওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে পরিষ্কার পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা বংশবিস্তার করে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে ও করণীয়
শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে তাদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। গর্ভবতী নারীদের নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা এবং নবজাতকের বুকের দুধ খাওয়ার স্বাচ্ছন্দ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ত্রাণ বিতরণের সময় শিশুখাদ্য, স্যানিটারি প্যাড ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে।
জলাবদ্ধতার পানি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। পানিতে নামতে হলে পরে সাবান দিয়ে হাত-পা ধুতে হবে এবং শরীরের কাটা অংশ ঢেকে রাখতে হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


