জিপিএমবি’র প্রতিবেদন

মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব এখনো নিরাপদ নয়

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব এখনো নিরাপদ নয়
২০২৬ সালের ১০ মে, স্পেনের টেনেরিফ বিমানবন্দরে হান্টাভাইরাস-আক্রান্ত প্রমোদতরী এমভি হন্ডিয়াস থেকে অবতরণের পর বিমানে ওঠার আগে স্প্যানিশ কর্মকর্তারা একজন যাত্রীর ওপর জীবাণুনাশক স্প্রে করছেন। ছবি: এপি

বিশ্বজুড়ে সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রতিরোধ সক্ষমতা দিন দিন কমছে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআরসি) এবং উগান্ডায় ইবোলা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার মধ্যেই এ সতর্কবার্তা এল।

সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গ্লোবাল প্রিপেয়ার্ডনেস মনিটরিং বোর্ড (জিপিএমবি) জানিয়েছে, ‘সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব যেমন ঘন ঘন হচ্ছে, তেমনি এগুলো আগের চেয়ে আরো বেশি মারাত্মক বা ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।’

বিজ্ঞাপন

সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, ‘মহামারির ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতির পেছনে যে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, ঝুঁকি তার চেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে এবং বিশ্ব এখনো অর্থপূর্ণভাবে নিরাপদ হয়ে ওঠেনি।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু সংকট এবং সশস্ত্র সংঘাতের কারণে রোগের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা আরো বাড়ছে। অন্যদিকে, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং বাণিজ্যিক স্বার্থপরতার কারণে সম্মিলিত বৈশ্বিক উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে।

২০১৮ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় প্রথম বড় আকারের ইবোলা প্রাদুর্ভাবের পর এবং কোভিড-১৯ মহামারির ঠিক আগে বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যৌথভাবে এই বিশেষজ্ঞদল (জিপিএমবি) গঠন করে। ক্রুজ শিপে হান্তা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের দিকে বৈশ্বিক মনোযোগ এবং কঙ্গোতে ইবোলায় অন্তত ৮৭ জনের মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরদিনই তাদের এই সর্বশেষ তথ্য সামনে এল।

জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডব্লিউএইচও প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, ‘এই দুটি প্রাদুর্ভাব আমাদের সমস্যাগ্রস্ত বিশ্বের সাম্প্রতিকতম সংকট মাত্র।’

কঙ্গোতে ডব্লিউএইচও’র প্রতিনিধি অ্যান আনসিয়া রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করতে গিয়ে রাজধানী কিনশাসায় তাদের সুরক্ষাসামগ্রীর মজুত শেষ হয়ে গেছে। কেনিয়ার একটি ডিপো থেকে অতিরিক্ত সরঞ্জাম আনার জন্য তারা একটি কার্গো বিমানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি এবং মেদসাঁ সঁ ফ্রোঁতিয়েরের মতো সাহায্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তাদের দল কাজ করছে। এই ভাইরাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এবং ভ্যাকসিন, পরীক্ষা ও ওষুধের গবেষণা কোন দিকে হওয়া উচিত তা নির্ধারণে আগামী শুক্রবার শীর্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি জরুরি বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক পরামর্শসভার আয়োজন করবে ডব্লিউএইচও।

জেনেভায় জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর গ্লোবাল হেলথ পলিসি অ্যান্ড পলিটিক্স-এর পরিচালক অধ্যাপক ম্যাথিউ কাভানাঘ বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বা অনুদান কমিয়ে দেওয়ার কারণে বিশ্বকে আজ একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে পিছিয়ে থেকে লড়াই করতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক পরীক্ষাগুলোতে ভুল ইবোলা স্ট্রেন খোঁজার কারণে ফলাফল নেতিবাচক এসেছিল এবং আমরা সাড়া দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েক সপ্তাহ সময় হারিয়েছি। ততক্ষণে ভাইরাসটি প্রধান প্রধান পরিবহন রুট দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে চলে গেছে। ডব্লিউএইচও থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার তুলে নিলে এবং ইউএসএআইডি-এর ফ্রন্টলাইন কর্মসূচিগুলো বন্ধ করে দিলে ভাইরাসের আগাম নজরদারি ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়ে।’

জিপিএমবি-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমআরএনএ-র মতো নতুন ভ্যাকসিন প্ল্যাটফর্মসহ আধুনিক প্রযুক্তিগুলো নজিরবিহীন গতিতে অগ্রসর হয়েছে এবং মহামারি মোকাবিলায় শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু ভ্যাকসিন, পরীক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে সমতা বা সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপগুলোতে বিশ্ব পেছনের দিকে হাঁটছে।’

সাম্প্রতিক মাঙ্কিপক্স প্রাদুর্ভাবের সময় আফ্রিকায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ভ্যাকসিন পৌঁছাতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল, যা কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের ১৭ মাসের চেয়েও ধীরগতির।

সংস্থাটি সতর্ক করেছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ এবং বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণের কারণে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সমাজকে পরবর্তী জরুরি অবস্থার সামনে কম সহনশীল করে তুলেছে।

জিপিএমবি-এর সহসভাপতি এবং ক্রোয়েশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কোলিন্ডা গ্রাবার-কিতারোভিচ বলেন, ‘বিশ্বে সমাধানের অভাব নেই। কিন্তু আস্থা ও সমতা না থাকলে সেই সমাধানগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।’

চলতি সপ্তাহে জেনেভায় ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলির আগে দেশগুলো মহামারি চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার সময়সীমা মিস করেছে। কোনো দেশের ভূখণ্ডে উদ্ভূত প্যাথোজেনের তথ্য শেয়ার করার বিনিময়ে চিকিৎসা পরীক্ষা, ভ্যাকসিন এবং চিকিৎসার সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে মতবিরোধের জেরে এই চুক্তি সম্পন্ন হতে পারেনি।

জিপিএমবি রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন তারা মহামারি ঝুঁকি ট্র্যাক করার জন্য একটি স্থায়ী ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, সমতা নিশ্চিত করতে মহামারি চুক্তি সম্পন্ন করেন এবং প্রাদুর্ভাবের তাৎক্ষণিক মোকাবিলায় অর্থায়নের ব্যবস্থা করেন।

জিপিএমবি-এর আরেক সহসভাপতি এবং বতসোয়ানার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জয় ফুমাফি বলেন, ‘আস্থা ও সহযোগিতা যদি এভাবে ভেঙে পড়তে থাকে, তবে পরবর্তী মহামারি আঘাত হানলে প্রতিটি দেশ আরো বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন