ওজন কমানোর নতুন ওষুধে মিলল নাটকীয় সাফল্য

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ওজন কমানোর নতুন ওষুধে মিলল নাটকীয় সাফল্য
ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন কমানোর ক্ষেত্রে বাজারে থাকা বিদ্যমান ওষুধগুলোর চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর একটি পরীক্ষামূলক নতুন ইনজেকশন উদ্ভাবন করেছে ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইলাই লিলি।

একটি বড় ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক প্রয়োগে এই ইনজেকশনটি গ্রহণকারীদের ওজন নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে বলে বৃহস্পতিবার লিলি’র পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তীব্র স্থূলতায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই ওষুধের কার্যকারিতা গ্যাস্ট্রিক বাইপাস সার্জারির কাছাকাছি, যা এ ধরনের রোগীদের ওজন কমানোর একমাত্র কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হতো।

‘রেটাট্রুটাইড’ নামের এই নতুন ওষুধটিকে ওজন কমানোর ইনজেকশন ও বড়িগুলোর মধ্যে এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ মনে করা হচ্ছে।

অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু অংশগ্রহণকারী এই ইনজেকশন নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, কারণ তাদের মনে হয়েছে তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ওজন হারিয়ে ফেলছেন।

অবশ্য ইলাই লিলি এই ফলাফলটি কেবল একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। এটি এখনো কোনো মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত বা বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচিত হয়নি।

ওষুধটির এই শক্তিশালী কার্যকারিতার কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। উচ্চ মাত্রায় ওষুধটি ব্যবহারের ফলে পরিপাকতন্ত্রে এমন অস্বস্তিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় যে কিছু রোগী এটি নেওয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। সর্বোচ্চ মাত্রা গ্রহণকারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১১ শতাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে এই গবেষণা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, যা বাজারে থাকা অন্যান্য কম শক্তিশালী স্থূলতার ওষুধের চেয়ে বেশি। এই ধরনের ওষুধ সাধারণত বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে, তবে সেগুলো খুব কমই গুরুতর হয়।

ইলাই লিলি এখনো এই ওষুধের বাজারজাতকরণের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের আবেদন করেনি। তবে এর মধ্যেই এটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এমনকি ট্রায়ালের আশাব্যঞ্জক ফলাফলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু মার্কিন নাগরিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে চীনের তৈরি এর নকল সংস্করণ অর্ডার করছেন, যা চিকিৎসকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

চিকিৎসকদের আশঙ্কা, যথাযথ নজরদারি ছাড়া এগুলো ব্যবহারে রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনে ভুগছেন এমন ২ হাজার ৩৩৯ জন রোগীর ওপর এই জরিপ চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ওষুধের সর্বোচ্চ মাত্রা গ্রহণকারীরা ৮০ সপ্তাহ পর গড়ে ৭০ পাউন্ড বা তাদের শরীরের ওজনের ২৮ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছেন। আর যাদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) ৩৫-এর ওপরে, অর্থাৎ মাঝারি থেকে তীব্র স্থূলতায় আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রে দুই বছর পর দেখা গেছে তারা গড়ে ৮৫ পাউন্ড বা ওজনের ৩০.৩ শতাংশ হারিয়েছেন। এর বিপরীতে গ্যাস্ট্রিক বাইপাস সার্জারির মাধ্যমে দুই বছরে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ওজন কমে।

নতুন এই ওষুধের কার্যকারিতা বাজারে বহুল জনপ্রিয় ইলাই লিলি’র ‘জেপবাউন্ড’ এবং নভো নরডিস্কের ‘ওয়েগোভি’ ইনজেকশনকেও ছাড়িয়ে গেছে, যা সাধারণত সমপরিমাণ সময়ে প্রায় ২০ শতাংশ ওজন কমাতে পারে। আর বড়ি বা পিল সংস্করণে ওজন কমে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ।

‘রেটাট্রুটাইড’ ইনজেকশনটি সপ্তাহে একবার দিতে হয় এবং পরিপাকতন্ত্রের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে এর ডোজ বা মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়। এটি মূলত ‘জিএলপি-১’ গোত্রের একটি উন্নত সংস্করণ, যা মানুষের ক্ষুধা, শক্তির ভারসাম্য এবং বিপাক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সাহায্যকারী তিনটি হরমোনকে প্রভাবিত করে।

ইলাই লিলি’র প্রধান বিজ্ঞানী ড. ড্যানিয়েল স্কোভ্রনস্কি বলেন, যারা বিপুল পরিমাণ ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য এটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় হতে পারে।

ইয়েল-এর স্থূলতা বিশেষজ্ঞ এবং এই গবেষণার প্রধান গবেষক ড. আনিয়া জাস্ট্রেবফ এই ফলাফলকে ‘খুবই চিত্তাকর্ষক’ বলে অভিহিত করেছেন।

তবে তিনি যোগ করেন, স্থূলতা একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং শুধু কত পাউন্ড ওজন কমল তা-ই নয়, বরং মানুষের আজীবন স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব কেমন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

ওজন কমানোর ওষুধের জনপ্রিয়তার বাজারে এই নতুন ওষুধটি ইলাই লিলি’র জন্য ব্যবসা আরো বাড়ানোর একটি বড় সুযোগ। জেপবাউন্ড এবং ডায়াবেটিসের ওষুধ মাউঞ্জারোর কল্যাণে গত শরতে ইলাই লিলি স্বাস্থ্যসেবা খাতের প্রথম কোম্পানি হিসেবে ১ লাখ কোটি ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে।

এদিকে ২০২৪ সালে ইলাই লিলি ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। তাদের দাবি, সংস্থাটি রেটাট্রুটাইড-কে ঐতিহ্যবাহী রাসায়নিক ওষুধের পরিবর্তে ‘বায়োলজিক’ ওষুধ হিসেবে ভুলভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।

রেটাট্রুটাইডের রাসায়নিক গঠনে কতটি অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে-সেই প্রযুক্তিগত বিষয় নিয়ে এই আইনি লড়াই এখনো আদালতে চলছে। ওষুধটি যদি ‘বায়োলজিক’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তবে বাজারে প্রতিযোগীদের আটকে রেখে দীর্ঘদিন উচ্চ মূল্য বজায় রাখতে পারবে কোম্পানিটি, যা তাদের কোটি কোটি ডলারের বাড়তি মুনাফা এনে দেবে।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন