অক্টোবর স্তন ক্যানসার সচেতনতার মাস। বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরাম কয়েক বছর ধরেই মাসব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার গোলাপি সড়ক শোভাযাত্রা নিয়ে দুদিনের জন্য ঢাকা থেকে বরিশালে যাওয়ার আয়োজন করে সংগঠনটি। এবারের মিশন বরিশাল। আমিও এই গোলাপি শোভাযাত্রায় অংশ নিতে ২৩ অক্টোবর শুক্রবার সকাল ৮টায় চলে গেলাম রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। সেখানে গোলাপি ব্যানারে মোড়ানো একটি এসি বাস দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে একটি প্রাইভেট কার ও একটি মাইক্রোবাস। চিকিৎসকদের সঙ্গে বিভিন্ন পেশা ও সংগঠনের ৪০ জনের একটি দল বরিশালের উদ্দেশে রওনা হলাম। আমাদের লক্ষ্য, বরিশালে যাওয়া ও আসার পথে স্তন ক্যানসার সচেতনতাবিষয়ক লিফলেট বিতরণ এবং পথসভা করা।
প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন করেন ক্যানসার রোগতত্ত্ব ও প্রতিরোধ বিশেষজ্ঞ এবং ফোরামের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন। তার আমন্ত্রণেই মূলত আমাদের এই মিশন। প্রথমেই আমাদের গাড়িবহর মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে গিয়ে থামে। সবাই গাড়ি থেকে নামলাম। সেখানে একটি পথসভা করা হলো এবং বেশ কিছু সময় সড়কে লিফলেট বিতরণ করা হলো। এরপর আমরা সবাই আবার গাড়িতে উঠে পড়ি। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ফরিদপুরের ভাঙ্গা। একইভাবে ভাঙ্গাতেও আমাদের দলের সবাই বাস থেকে নেমে যান। সেখানে আমরা লিফলেট বিতরণ শুরু করি। পথসভায় চিকিৎসকরা সচেতনতামূলক বক্তব্য দেন।
আমাদের মূল গন্তব্য বরিশাল। সেখানে বেশ কিছু কর্মসূচি করার কথা। তাই ফরিদপুর ছেড়ে আরো কয়েকটি জায়গায় থেমে আমরা পৌঁছে যাই বরিশালের গৌরনদীতে। দুপুরের খাবারের জন্য আমাদের একটি গেস্টহাউসে নেওয়া হয়। দুপুরের পরই বরিশাল সদরে গিয়ে প্রচারণা শুরু করার পরিকল্পনা। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষে রাসকিন ভাই বললেন, ‘সময় নষ্ট করা যাবে না। আমরা এখনই বরিশাল সদরে চলে যাব। সন্ধ্যার আগেই গিয়ে কাজ শুরু করে দেব।’
দেরি না করে আমরা গাড়িতে উঠে বসি। সন্ধ্যার আগেই বরিশাল সদরে পৌঁছে যাই। লিফলেট হাতে সদরের অলিগলিতে ঢুকে পড়েন আমাদের দলের সদস্যরা। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও লিফলেট বিতরণ চলে। সেই সঙ্গে সেখানে একটি পথসভাও করা হয়। শুনেছি, বরিশালের বেলস পার্কে সন্ধ্যার পর বেশ লোকজন থাকে। তাই আমরা দেরি না করে বেলস পার্কে চলে যাই। অনেক মানুষ সেখানে ঘোরাফেরা করছেন, কেউ কেউ মাঠে বসে গল্প করছেন। দারুণ পরিবেশ। প্রথমে আমাদের দলের সদস্যরা মাঠের চারদিকে ঘুরে বেড়ানো মানুষের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেন। এরপর সেখানে একটি পথসভার আয়োজন করা হয়।
মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বক্তব্য শুরু করলেন চিকিৎসক হুমায়ূন কবীর। তিনি বলেন, ‘যার পরিবারে একজন ক্যানসারে আক্রান্ত হন, তিনিই একমাত্র বুঝতে পারেন, কীভাবে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায় একটি পরিবার। আমরা বহু ক্যানসার আক্রান্ত মা-বোনকে দেখেছি, যাদের স্বামীরা তালাক দিয়ে দিয়েছেন। আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। কীভাবে ওই মা-বোনদের মানসিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা যায়, তা নিয়ে ভেবেছি। আমরা স্তন ক্যানসার সচেতনতার যে লিফলেটটি দিচ্ছি, সবাই গুরুত্ব দিয়ে পড়ুন। স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে জানুন। সন্দেহ হলে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, সে সম্পর্কে জানাতেই আমাদের এই লিফলেট বিতরণ।’
বেলস পার্কে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে আমরা আরো দুটি স্থানে গিয়ে লিফলেট বিতরণ করি। এরপর রাত বাড়লে সদরের একটি আবাসিক হোটেলে চলে যাই। পরদিন আমাদের বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে যেতে হবে। তাই রাসকিন ভাই সবাইকে জানিয়ে দিলেন, সকালে দেরি করা যাবে না। সকাল ৯টায় আমরা সেখানে পৌঁছে যাব। রাতের খাবার খেয়ে যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়ি।
সকালে নাশতা খেয়ে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা চলে আসি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। এটাই আমাদের প্রধান কর্মসূচির স্থান। তাই দেরি না করে কয়েকজন ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। রাসকিন ভাই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বললেন, ‘গোলাপি সাজানো বাস নিয়ে আমরা লিফলেটগুলো বিভিন্ন রুটে বিতরণ করি। এবার বরিশালে এসেছি দুদিনের কর্মসূচিতে। ঢাকা থেকে রওনা হয়ে অনেক জায়গায় থেমে এ ধরনের পথসভা করে এসেছি। এখান থেকে গিয়ে আমরা আরও প্রায় ৮-৯টি জায়গায় যাব। মাদারীপুর, শরীয়তপুর থেকে শুরু করে নরসিংদী হয়ে ঢাকায় ফিরব। আমাদের উদ্দেশ্য, স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক প্রতিরোধ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। এটি যাতে না হয়, সেজন্য কিছু ভালো অভ্যাস গ্রহণ করব এবং কিছু খারাপ অভ্যাস বর্জন করব। যদি প্রাথমিক অবস্থায় বা সূচনাতেই রোগটি শনাক্ত করা যায়, তাহলে চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি।’
রাসকিন ভাইয়ের বক্তব্য চলছে। অন্যদিকে আমাদের দলের সদস্যরা হাসপাতালে আসা-যাওয়া করা মানুষের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করছেন। অনেক নারীকে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে সেগুলো পড়তে দেখা গেল। বরিশাল মেডিকেল কলেজে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ডা. নাঈমুল ইসলাম হাসিব। রাসকিন ভাই নিজের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করে তার হাতে মাইক্রোফোন তুলে দিলেন। ডা. হাসিব বলেন, ‘আপনারা স্তন ক্যানসারের ভয়াবহতা সম্পর্কে শুনেছেন। এই ক্যানসার প্রতিবছর অসংখ্য মা-বোনকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি খুব সহজে প্রতিরোধ করা যায়। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে অল্প খরচে এর চিকিৎসা করা যায়। আমরা দেরি করে চিকিৎসকের কাছে আসি। আমাদের মা-বোনরা লজ্জা বা সংকোচের কারণে বিষয়টি জানান না। সেজন্য রোগটি দেরিতে ধরা পড়ে এবং ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়।’
বরিশাল মেডিকেল কলেজে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে আমরা চলে যাই দুর্গাসাগরে। সেখানে অনেক লোকজন ঘুরতে যান। আমাদের লক্ষ্য, তাদের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করা। এখানেও একইভাবে মানুষের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করে আমরা মাদারীপুরের উদ্দেশে রওনা দিই।
দুপুর গড়িয়ে আমরা মাদারীপুরে পৌঁছাই। গাড়ি থেকে নেমে আবার বেশ কয়েকজন ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে যান। এবার মাইক্রোফোন হাতে নিলেন কমিউনিটি অনকোলজি সেন্টার ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা মোছাররত সৌরভ। তিনি বলেন, ‘স্তন ক্যানসার শুধু নারীদের হয়, তা নয়; পুরুষদেরও এই ক্যানসার হয়। তবে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। নারীদের লজ্জা ও সংকোচ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে—এটাই মূল কথা। স্তন ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে চিকিৎসা করা হলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ কারণেই আমরা বিভিন্ন জায়গায় যাই, র্যালি করি, এই সড়ক শোভাযাত্রার আয়োজন করি। ঢাকায় করি, ঢাকার বাইরেও করি। এভাবে পথসভা করে সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। কোনো লক্ষণ দেখা গেলে স্বাচ্ছন্দ্যে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া খুব জরুরি—এটা তাদের বোঝাতে হবে। চিকিৎসক নারী না পুরুষ, তা নিয়ে চিন্তা করলে চলবে না। ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। কারণ, স্তন ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার সময়ই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগটি দ্বিতীয় পর্যায়ে চলে গেছে এবং দ্রুত ছড়াচ্ছে। সেজন্য রোগটিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সচেতন থাকা প্রয়োজন।’
একদিকে আমাদের পথসভা চলছে, অন্যদিকে দলের অন্য সদস্যরা লিফলেট বিতরণ করছেন। এভাবেই চলছে আমাদের স্তন ক্যানসার সচেতনতার গোলাপি সড়ক শোভাযাত্রা। মাদারীপুর থেকে এবার আমরা শরীয়তপুরের উদ্দেশে রওনা হই। একইভাবে শরীয়তপুরের কয়েকটি স্থানে পথসভা করে রাতেই আমরা ঢাকায় ফিরে আসি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

