দেশে অনেক ভালো মানের প্রাইভেট হাসপাতাল আছে, ভালো চিকিৎসাও হচ্ছে; তবুও রোগীরা কেন উন্নত চিকিৎসার আশায় পাশের দেশগুলোয় ছুটে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবং প্রাইভেট হাসপাতালের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আজ আমরা ‘হ্যালো ডাক্তার’ বিভাগে কথা বলব ডা. এবিএম হারুন-এর সঙ্গে।
প্রশ্ন : সরকারি হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকায় রোগীরা প্রাইভেট হাসপাতালে ছুটে আসেন। সে ক্ষেত্রে আপনাদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে?
উত্তর : আমরা আসলে চাই না, সরকারি হাসপাতাল থেকে যাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নেই, তারা প্রাইভেটে আসুক। আমি চাইব, সরকার যে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগটা দিচ্ছে মানুষকে, সে সুবিধাটা যেন তারা গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু ইমারজেন্সি রোগী হলে তো আমাদেরকে ভর্তি নিতে হয়। চিকিৎসাসেবা দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হয়। রোগীকে যতদূর সম্ভব আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা আমরা করি। এতে রোগীরা উপকৃত হয়, অনেক ক্ষেত্রে আমরাও অনেক খুশি হই যে রোগীটাকে একটু খেদমত করতে পেরেছি।
প্রশ্ন : আপনারা বলছেন, দেশে ভালো চিকিৎসা হচ্ছে। তবুও উন্নত চিকিৎসার আশায় রোগীরা বিদেশমুখী হচ্ছেন কেন?
উত্তর : আসলে বাংলাদেশের প্রাইভেট স্বাস্থ্যসেবা চালু হয় ২০০০-এর দশকে। এর আগে মূলত সরকারি হাসপাতালের ওপরে আমরা নির্ভরশীল ছিলাম। তখন যেহেতু প্রাইভেট মেডিকেল সার্ভিস তেমন উন্নত হয়নি, তাই রোগীরা ভারতে যাওয়ার জন্য বেশি আগ্রহী হতো। সেখানে যাওয়া-আসার খরচ কম এবং চিকিৎসা ব্যয় সামান্য একটু বেশি হলেও ওরা অনেক অরগানাইজড ওয়েতে চিকিৎসা করত। কিন্তু আমরা মনে করি, বর্তমানে মাথা থেকে পা পর্যন্ত যত রকমের রোগ বলেন, ক্যানসার, হার্ট, লাং, লিভার, কিডনি—প্রত্যেকটা রোগের চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় আমাদের দেশে হচ্ছে। বলতে পারেন, বিদেশের ২৫ শতাংশ ব্যয়ে এই চিকিৎসা করা সম্ভব। একটি মানসিক চিন্তা থেকে মানুষ চিকিৎসা নিতে বিদেশমুখী হয়। কেউ কেউ মনে করেন, ‘আমার বাবার চিকিৎসা দেশে করালে যদি কিছু হয়ে যায়?’ এ ধরনের চিন্তা থেকে অনেকে জায়গাজমি বিক্রি করে হলেও বিদেশে বাবাকে নিয়ে যায় চিকিৎসা করাতে। তবে এই মানসিকতা থেকে অনেকে ফিরে আসছে। কারণ ১৯৯২-৯৩ সালে এনজিওগ্রাম করার জন্য মানুষ কলকাতা যেত। এখন বাংলাদেশে প্রতিদিন তিন-চার হাজার এনজিওগ্রাম হয়। আগে বাইপাস করাতে বিদেশে যেত রোগীরা। এখন বাংলাদেশে দিনে ১০০ থেকে ১৫০ বাইপাস সার্জারি করা হয়। শুধু তা-ই নয়, ক্যানসারের রেডিওথেরাপির মেশিন থেকে শুরু করে প্রায় প্রত্যেকটা চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে হচ্ছে। ক্যানসারের সার্জারি অন্তত সাকসেসফুল হচ্ছে। কাজেই আমি মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের বিদেশে যাওয়ার দরকার নেই চিকিৎসার জন্য। যদি আমরা কোনো কারণে চিকিৎসা করতে ব্যর্থ হই, সে ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তা করা উচিত বলে আমি মনে করি।
প্রশ্ন : হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মান আরো ভালো করতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর : আমাদের যারা স্বাস্থ্যসেবায় আছেন—চিকিৎসক, সেবিকা; তারপর হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়, আয়া এবং হাসপাতালের স্টাফ—প্রত্যেকেরই ব্যবহারিক দিক থেকে আরো উন্নত হওয়ার দরকার আছে। এদিকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এদিক দিয়ে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। আমি মনে করি, মেডিসিন, সার্জারি ও নার্সিং লেখাপড়ায় ব্যবহারিক বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক সিস্টেম নিয়ে একটা ক্লাস থাকা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে কীভাবে আমরা রোগীকে আশ্বস্ত করতে পারি, রোগীর আত্মীয়স্বজনকে আশ্বস্ত করতে পারি, হেসে কথা বলতে পারি, সবশেষে যতদূর সম্ভব যদি আমরা আর্থিক সাহায্য করতে পারি—এ বিষয়গুলো নিয়ে ক্লাস হতে পারে।
প্রশ্ন : দেশের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট অসন্তোষ আছে। আপনার হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয় নির্ধারণের নীতি কেমন?
উত্তর : আমরা ১৯৮৪ সালে পরীবাগে ছোট্ট পরিসরে ‘শমরিতা নার্সিং হোম’ চালু করি। তখন আমাদের সিটভাড়া ছিল ৫০ টাকা। দেশের অর্থনীতি অনেক ভালো ছিল, চাল-ডাল-তেল-নুনের দাম অনেক কম ছিল। ধীরে ধীরে যখন দিন এগোলো, চিকিৎসাব্যয় বৃদ্ধি পেল। চিকিৎসক এবং চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত সব স্টাফের বেতন বাড়ল। গভার্নমেন্ট ট্যাক্স ও ভ্যাট চালু করল—মেডিকেল যন্ত্রপাতি ও ডায়াগনস্টিক রিএজেন্টের (reagent) ওপর অনেক ট্যাক্স বাড়ল। তখনই চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেছে, যেটা আমাদের হাতে নেই। তবুও আমাদের টার্গেট থাকে, যেহেতু আমরা গরিব দেশ, আমাদের আত্মীয়স্বজনেরাই অনেক গরিব—এসব ভেবে আমাদের সাহায্যের হাত বাড়ানো উচিত। অনেক সময় লিমিটেশনের কারণে অনেক কিছু করা সম্ভব হয় না। যেমন এখানে বিদ্যুৎ বিলটা কমার্শিয়াল রেটে গভার্নমেন্ট নেয়। আমরা সরকারকে অনেক বলেছি, আমাদের বিদ্যুৎ বিল বাসাবাড়ির রেটে নেওয়া হোক, সুবিধাটা রোগীর লোকেরা পাবে। গ্যাস-পানি—এগুলোও কমার্শিয়াল হিসেবে ট্রিট করা হয়। এতে আমাদের ইউটিলিটি বিল বাড়ায় খরচ অনেক বেড়ে যায়।
প্রশ্ন : চিকিৎসা করতে গেলে ভুলভ্রান্তি হয়। রোগীদের অভিযোগ ও হয়রানির বিষয়গুলো আপনারা কীভাবে সমাধান করে থাকেন?
উত্তর : আমার মনে হয়, প্রত্যেকটা হাসপাতালে একটা অভিযোগপত্র হতেই পারে এবং সেই অভিযোগপত্র তারা কর্তব্যরত কর্মকর্তার কাছে দেবে। প্রতিটা হাসপাতালেই চেষ্টা করা হয় এগুলো অ্যানালাইসিস করতে। কোনো চিকিৎসকের যদি ভুল হয়, তাহলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল হলো আমাদের রেগুলেটরি বডি—তারা ইচ্ছা করলে একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যেকোনো অ্যাকশন নিতে পারে, তার লাইসেন্সও কেটে দিতে পারে। আমি মনে করি, রোগীর আত্মীয়স্বজনের অসহিষ্ণু হওয়া উচিত নয়; তাদের বোঝা উচিত, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সব চিকিৎসার ক্ষমতা দেননি। কিছু রোগ আছে, যেগুলোর চিকিৎসা এখনো সাকসেসফুল হয় না, রোগীরা খারাপ হয়ে যেতে পারে; আমরা শুধু চেষ্টা করতে পারি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

