বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের অবসর সময়ের অন্যতম সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন কনটেন্টে বুঁদ হয়ে থাকি বেশির ভাগ সময়। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় কনটেন্টের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অনেক ছোট-বড় কনটেন্ট ক্রিয়েটর। এক দশক আগেও ‘কনটেন্ট নির্মাণ’ বলতে আমরা মূলত ব্লগ লেখা বা খুব সাধারণ মানের ভিডিও ধারণ বুঝতাম। ২০২৬ সালের এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে কনটেন্ট নির্মাণ একটি শৈল্পিক কর্মে পরিণত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) এবং উচ্চগতির ইন্টারনেটের উন্নতির ফলে আজ কনটেন্ট নির্মাণের সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়ে রূপ নিয়েছে বিভিন্ন নামে।
ভালো মানের কনটেন্ট তৈরিতে প্রয়োজন কনটেন্ট নির্মাণের দক্ষতা। ভালো মানের কনটেন্ট নির্মাণের জন্য দরকার স্ক্রিপ্টিং, শুটিং, ভিডিও এডিটিং, ভয়েসওভারসহ অনেক ধরনের উপাদান। প্রযুক্তির ব্যবহার বর্তমানে কনটেন্ট নির্মাণকে সহজতর করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই তৈরি করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে উন্নত মানের কনটেন্ট। লেখালেখি, স্ক্রিপ্ট তৈরি, আইডিয়া জেনারেশন, এমনকি ছবি ও গ্রাফিক ডিজাইনেও এআই এখন কার্যকর সহায়ক। এছাড়া কনটেন্ট নির্মাণের জন্য আগে অনেক সময়ের প্রয়োজন হতো। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন টুলস ব্যবহার করে খুব সহজেই, কম পরিশ্রম ও সময় ব্যয়েই কনটেন্ট তৈরি করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। মেটাভার্সের আগমনে ভার্চুয়াল ইনফ্লুয়েন্সার বা ডিজিটাল অ্যাভাটারদের মাধ্যমে ব্র্যান্ড প্রচারের নতুন এক দ্বার খুলে গেছে। কনটেন্ট নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো।
কনটেন্ট রাইটিং
সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ধরনের পোস্ট তৈরি করতে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অ্যাপস যেমন : OpenAI-এর তৈরি ChatGPT, Google-এর Gemini কিংবা Adobe-এর Adobe Firefly কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য বিপ্লব এনেছে। ফলে সময় বাঁচছে, উৎপাদনশীলতা বাড়ছে। এছাড়া কোনো পণ্যের প্রচারের জন্য বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় পোস্ট বা ব্লক তৈরিকে ওপরের অ্যাপসগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। কনটেন্ট নির্মাণের জন্য কেমন কনটেন্ট চাই, তার একটা ছোট বিবরণ বা কিছু গুরুত্বপূর্ণ কী-ওয়ার্ড দিলে চ্যাটজিপিটি, জেমিনি বা এমন ধরনের চ্যাটবট কনটেন্টটি তৈরি করে দেবে। ভিডিও কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে এখন স্মার্টফোন এক শক্তিশালী স্টুডিও। উন্নতমানের ক্যামেরা, স্ট্যাবিলাইজেশন প্রযুক্তি এবং এডিটিং অ্যাপের কারণে স্বল্প বাজেটেও মানসম্মত ভিডিও তৈরি সম্ভব। Adobe Premiere Pro, Final Cut Pro কিংবা মোবাইলভিত্তিক CapCut-এর মতো সফটওয়্যার সম্পাদনা (Editing) প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে। একই সঙ্গে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) প্রযুক্তি সংবাদ ও বিনোদন কনটেন্টে নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত করছে।
অ্যানিমেশন
বাংলাদেশে বর্তমানে অ্যানিমেশন ভিডিও তৈরির চাহিদা অনেক বেশি। অনেকেই কনটেন্টে অ্যানিমেশন যুক্ত করতে চায়। অ্যানিমেশন ভিডিও তৈরি করতে লিওনার্দোÑএআই, পিকা-ল্যাব, পিকট্রয়, রানওয়ে-এলো-এর মতো দুর্দান্ত সব অ্যাপস রয়েছে। এসব অ্যাপস ব্যবহার করে খুব সহজেই অ্যানিমেশন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। অ্যানিমেশন ভিডিও তৈরির জন্য দৃশ্যের বিবরণ দিতে হবে। সঠিকভাবে দৃশ্যের বর্ণনা দিতে পারলে এই অ্যাপসগুলো খুব ভালো মানের অ্যানিমেশন ভিডিও তৈরি করতে সক্ষম।
ভয়েসওভার
কনটেন্ট তৈরিতে ভয়েসওভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। তবে অনেকেই নিজের ভয়েস দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কারো কারো আবার ভয়েসওভার করতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যায়। তবে, ভয়েস ক্লোনিং ও এআই ভয়েসওভারের মাধ্যমে খুব সহজেই এখন ভয়েসওভার করা সম্ভব হচ্ছে। ইলিভেন ল্যাবস, মুরফ এআইয়ের মতো অ্যাপসগুলো ব্যবহার করে খুব সহজেই বিভিন্ন ধরনের ভয়েস দ্বারা ভয়েসওভার করা সম্ভব।
সংবাদমাধ্যমে প্রযুক্তি
সংবাদপত্রের প্রতিবেদকরা দ্রুত তথ্যবিশ্লেষণ, শিরোনাম তৈরি বা খসড়া লেখার কাজে এআই ব্যবহার করছেন। ক্লাউড প্রযুক্তি ও রিমোট টিমওয়ার্কের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমগুলোতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ক্লাউডভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম যেমন : Google Drive, Dropbox বা Microsoft OneDrive দলগত কাজকে সহজ করেছে। বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেও একাধিক ব্যক্তি একই প্রজেক্টে একসঙ্গে কাজ করতে পারছেন। সংবাদপত্রের আইটি টিম, গ্রাফিক ডিজাইনার ও রিপোর্টারদের মধ্যে সমন্বয়ও বাড়ছে।
ডেটা অ্যানালিটিকস
কনটেন্ট কতজন দেখছে, কীভাবে দেখছে, কোন বিষয় বেশি জনপ্রিয়Ñএসব বিশ্লেষণের জন্যও বিভিন্ন টুল খুব কার্যকর। Google Analytics বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনসাইট টুলের মাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাতারা দর্শকের আচরণ বিশ্লেষণ করতে পারছেন। অ্যালগরিদম এখন বুঝতে পারে কোন দর্শক কী পছন্দ করেন। ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে নির্মাতারা বুঝতে পারছেন তাদের অডিয়েন্সের নাড়ির স্পন্দন। ফলে কনটেন্ট হচ্ছে আরো সুনির্দিষ্ট এবং লক্ষ্যভেদী।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কনটেন্ট নির্মাণে এসেছে আমূল পরিবর্তন। তবে প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার সৃজনশীল শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলছে, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা যেমন সৃজনশীলতাকে অবারিত করেছে, তেমনি ডিপফেক বা ভুল তথ্যের মতো, চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছে। ভুয়া তথ্য কপিরাইট লঙ্ঘন কিংবা অতিরিক্ত এআই-নির্ভরতার ঝুঁকি বিবেচনায় রাখতে হবে। তাই প্রযুক্তিকে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করে মানবসৃষ্ট সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত প্রতিটি ক্ষেত্রে। মেধা ও প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারলে কনটেন্ট ক্রিয়েশন হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পেশা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

